শহীদ মিনার শূন্য কক্সবাজারের ৬ শতাধিক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা!

১:৩৪ অপরাহ্ন | রবিবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ চট্টগ্রাম
madrasa

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার সংবাদদাতা: ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পার হয়েছে। আর এবারের স্বাধীনতা দিবসে উদযাপন হবে দেশ স্বাধীনের অর্ধশত বছর। এত দীর্ঘ সময়েও কক্সবাজারে সরকারি সুবিধা নেয়া ৮ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার গড়ে উঠেনি। আর প্রায় দেড়শ মাদ্রাসার কোনটিতে নেই ভাষা শহীদদের স্মৃৃতির এ ফলক।

ফলে, ভাষার জন্য জীবন দেয়া বীর সেনানীদের বিষয়ে অজ্ঞতা ভর করছ শিক্ষার্থীদের। এতে মাতৃভাষা ও দেশের জন্য প্রাণ দেয়া বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও জান্মাচ্ছে না তাদের মনে। ফেব্রুয়ারি মাসে যেন-তেন ভাবে ভাষা শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও, আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের তাৎপর্য বা গুরুত্ব নেই শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের। কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকলেও তা অনেকটা ভগ্নদশায়।

২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান চালিয়ে নামমাত্র অনুষ্ঠান পালন করা হয়। আবার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এদিন বন্ধও থাকে। মাদ্রাসাগুলোতে শহীদ মিনারের অস্তিত্বতো নেই-ই, তার উপর সিংহভাগ মাদ্রাসা এসব দিবস পালনে বিমুখ। কারণ, অধিকাংশ মাদ্রাসা শিক্ষকরা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণকে ‘শরিয়ত বিরোধী’ বলে অভিহিত করেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সর্ম্পকে জানাতে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এর গুরুত্ব, উৎপত্তি, ইতিহাস সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু জানেনা প্রাথমিকসহ নানা স্তরের শিক্ষার্থীরা। শহীদ মিনার কী, কি কারণে ফুল দিতে হয় তা জানিয়ে দেয়ার মাধ্যম হতে পারে শহীদ মিনার। কিন্তু জেলার উচ্চ মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ হয়নি।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, জেলার ৬৫৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাত্র ১৬৭টিতে শহীদ মিনার রয়েছে। আর মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০৩টির মধ্যে রয়েছে ১৩৫টিতে। ২৩টি কলেজের মাঝে ৪টিতে এখনো শহীদ মিনার নেই। জেলার একমাত্র প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতেও নির্মিত হয়নি শহীদ মিনার। জাতীয় দিবসগুলোতে জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়।

কিন্তু জেলায় কয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজো শহীদ মিনার গড়ে উঠেনি বা কয়টিতে আছে তার সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্মকর্তারা।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলায় কামিল-ফাজিল-আলীম ও দাখিল মিলে মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ১৪৭টি। এর মধ্যে কামিল ৩টি, ফাজিল ১৩টি, আলিম ২৩টি, দাখিল ১০৮টি। সরকারি ১০টি ও বেসরকারি ১৩৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০টি।

দেখা যায়, জেলায় মাদ্রাসা শিক্ষায় সর্বোচ্চ এবং প্রাচীন প্রতিষ্ঠান হাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসাসহ তালিকায় থাকা মাদ্রাসার কোনটিতেই শহীদ মিনার নেই। ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটিতে দোয়া মাহফিল হলেও ফুল দিয়ে শহীদদের সম্মান জানানো হয় না এখানে।

এ বিষয়ে হাশেমিয়া মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোন মন্তব্য করতে চাননি। তবে, আরেক প্রাচীন মাদ্রাসা কক্সবাজার সদরের ছুরুতিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বশর বলেন, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া ‘শরিয়ত বিরোধী’ কাজ। ইসলাম এটাকে সমর্থন করেন। আমরা দোয়ার আয়োজন করে জাতীয় দিবসগুলো পালন করি। তবে সরকারীভাবে কোন নির্দেশনা দেয়া হলে তা পালন করি আমরা। ভবিষ্যতে শহীদ মিনার করার তাগাদা আসলে তাও বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে, শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও এর তাৎপর্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নজিবুল আলম বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা উচিত। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। শহীদদের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিসৌধ শৈশব থেকেই তাদের দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে।

সাহিত্যিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আবছার বলেন, পাঠ্যপুস্তক থেকে ভাষা আন্দোলনের সম্পর্কে জানার পাশাপাশি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার স্থাপন হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দেখতে দেখতে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারে। শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেয়া উচিত বলেও দাবি করেন তিনি।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ কামরুল আহসানের মতে, ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছরেও জেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। ভাষা আন্দোলনের ঘটনা আমাদের জাতীয়তাবোধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম তথা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণার উৎস-প্রতীক। ভাষা আন্দোলনের মর্যাদা-তাৎপর্য ধীরে ধীরে মানুষ ভুলে যাচ্ছে। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা কমে যাওয়ায় শহীদ মিনারকে তারা আর গর্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছে না। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং, এটা তাদের মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার সঠিক দীক্ষা, প্রাথমিক পাঠ ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে শহীদ মিনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুধুমাত্র শহরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাদের অভিভাবক সচেতন তারা শহীদ মিনার এবং ভাষা দিবসের গুরুত্ব সম্পর্কে মোটামুটি জানে কিন্তু তাও যথেষ্ট নয়।

তবে, শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য প্রাথমিক স্তরে কোন বরাদ্ধও নেই, নেই কোন নির্দেশনা। ফলে জেলার ৬৫৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৬৩৫ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার করা হয়নি।

কক্সবাজার জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, স্কুলগুলোতে শহীদ মিনার করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও মাদ্রাসার কথা সেখানে ছিল না। তাই কয়টি মাদ্রাসায় শহীদ মিনার আছে তা তদারকিতে নেই।

শহীদ মিনার না থাকা এবং জাতীয় দিবসগুলো মাদ্রাসায় উদযাপন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এসব দিবস সম্পর্কে অজ্ঞ থাকছে কি না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভাষা দিবসসহ সকল জাতীয় দিবস নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মাঝে একটু অস্বচ্ছ ধারণা জন্মানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত মতে এখন মাদ্রাসাতেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের রীতি চালু হয়েছে। কওমী মাদ্রাসাতেও এ রীতি চালুর তৎপরতা চলছে। এটা বেদাত (শরীয়ত বিরোধী) নয় সেটা সচেতনতার মাধ্যমে বোধে দিয়ে ধীরে ধীরে শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগও নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।

ককক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনূর রশীদ বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক বলতে পারবে সংশ্লিষ্টরা। এরপরও খোঁজ নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হবে।