ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর: চাঁদপুরের হাজারো বিদ্যালয়ে নেই শহীদ মিনার!

৬:৩৩ অপরাহ্ন | রবিবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২১ চট্টগ্রাম
school

মাহফুজুর রহমান, চাঁদপুর প্রতিনিধি- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পার হয়েছে। আর এবারের স্বাধীনতা দিবসে উদযাপন হবে দেশ স্বাধীনের অর্ধশত বছর। এত দীর্ঘ সময়েও চাঁদপুরে সরকারি সুবিধা নেওয়া হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার গড়ে উঠেনি। আর সিংহভাগ মাদ্রাসার কোনোটিতে নেই ভাষা শহীদদের স্মৃতির এ ফলক। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাই শিক্ষার্থীদের ছুঁটতে হয় দূর-দূরান্তে। স্কুল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন কোমলমতি শিশুসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও।

ভাষার জন্য জীবন দেওয়া ভাষা শহীদদের বিষয়ে কিছু জানে না শিক্ষার্থীরা। এতে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া বীরদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও জন্মাচ্ছে না তাদের মনে। ফেব্রুয়ারি মাসে যেনতেন ভাবে ভাষা শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও, আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের তাৎপর্য বা গুরুত্ব নেই শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকলেও তা অনেকটা ভগ্নদশায়।

২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গান চালিয়ে নামমাত্র অনুষ্ঠান পালন করা হয়। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এদিন বন্ধও থাকে। মাদ্রাসাগুলোতে শহীদ মিনারের অস্তিত্বতো নেই-ই, তার ওপর সিংহভাগ মাদ্রাসা এসব দিবস পালনে বিমুখ। কারণ, অধিকাংশ মাদ্রাসা শিক্ষকরা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণকে ‘শরিয়তবিরোধী’ বলে অভিহিত করেন।

সদর উপজেলার ৬নং আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১২৫নং কেজি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দুই স্কুলের খেলার মাঠ একটি। সেটি খুব বেশি বড় না হলেও একেবারে ছোট নয়। কিন্তু পুরো মাঠের কোথাও ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ শহীদ মিনার নেই। হয়তো এতদিনে এ স্কুল থেকে পড়ালেখা শেষে কেউ সচিব কেউবা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। যে ভাষায় তারা কথা বলতে শিখেছেন, সেই ভাষার জন্য ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন বীর ভাষাসৈনিকেরা, তাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের ন্যূনতম স্মৃতিস্তম্ভটিও নেই এ দুই বিদ্যালয়ে।

শুধু এ দুটিতেই নয়, জেলায় ১ হাজার ১৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৪৭টিতে সরকারি ভাবে শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়েছে। বাকি এক হাজারের বেশি স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রতিবছর অস্থায়ী শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চাঁদপুর সদর উপজেলার ১৭২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৬, হাইমচর উপজেলার ৭২ বিদ্যালয়ের ৬১, কচুয়ার ১৭১টির মধ্যে ১৪০, হাজীগঞ্জের ১৫৭টির মধ্যে ১২৫, শাহারাস্তির ১০১টির মধ্যে ৯০, ফরিদগঞ্জের ১৯০টির মধ্যে ১৬২, মতলব দক্ষিণে ১১৩টির মধ্যে ১০৭ এবং মতলব উত্তরের ১৮০ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫৮ প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নেই শহীদ মিনার।

এদিকে শহীদ মিনার স্থাপন না করার বিষয়কে সদিচ্ছার অভাব বলে মন্তব্য করেন জেলার সচেতন মহল। অনেকে বলেন, বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষিকের যৌথ উদ্যোগেও নির্মাণ করা যায় শহীদ মিনার। কিন্তু উদ্যোগ না নেয়ায় বেশিরভাগ বিদ্যালয় তা নির্মাণ সম্ভব হয়নি।

শিশুসাহিত্যিক ও লেখক হুমায়ূন কবীর ঢালী সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘ভাষা শহিদদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা মাতৃভাষা বাংলা পেয়েছি। আর ভাষা শহীদদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাস প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই দেশের প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ পাড়া-মহল্লায় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার স্থাপন আবশ্যক। শহিদ মিনার শুধু একদিন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়। শহিদ মিনার স্থায়ীভাবে নির্মিত না হলে এ প্রজন্মের কাছে শহীদ মিনারের গুরুত্ব কমে যাবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, প্রত্যেক স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। শহীদ মিনার তৈরী করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।