• আজ রবিবার। গ্রীষ্মকাল, ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ। দুপুর ১:৫৩মিঃ

মৃত্যু-ধ্বংসেও অপ্রতিরোধ্য কক্সবাজারের পাহাড় খেকোরা

১২:০৭ অপরাহ্ন | শনিবার, মার্চ ৬, ২০২১ চট্টগ্রাম
track

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: শ্রমিকের মৃত্যু, অভিযান, হামলা-মামলা, পরিবেশ আন্দোলন কর্মীদের বিরোধীতা কিংবা উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সবই আছে। তারপরও থেমে নেই পাহাড় ধ্বংস যজ্ঞ। কখনও দিনের আলোতে আবার কখনও রাতে আধারে চলে এই পাহাড় কাটার কাজ। এলাকার পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস করে এভাবে পাহাড় কাটে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী কিংবা প্রভাবশালী সবই একই সুতোয় গাঁথা। সবাই চান পাহাড় কাটা চলতেই থাকুক। বৈধ কিংবা অবৈধ উপায়ে হলেও পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করতে মরিয়া সকলেই।

কোন কিছুতেই থামছে না পাহাড় নিধন যজ্ঞ, শ্রমিকের মৃত্যু, পরিবেশের ক্ষতি কিংবা পাহাড় ধসে মৃত্যু, ঘরবাড়ি হারানো মানুষের কান্নাও তাদেরকে থামাতে পারছে না। পারছে না পুলিশ-উপজেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদফতরও। প্রথমদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পাহাড় কাটা বন্ধ করা হলে তা এখন চলে নিত্যদিন।

জেলার শত শত মানুষ নির্বিচারে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ধুম পড়েছে জেলা জুড়ে। এতে করে একদিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড়ে বসবাসরত প্রাণীগুলো হারাচ্ছে নিরাপদ আবাসস্থল।

কয়েকযুগ ধরে চোখের সামনে এই ধ্বংস যজ্ঞ চলতে থাকলেও জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের কাছে কতটি পাহাড় কাটা হয়েছে এমন কোনো তথ্য নেই। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশাপাশি উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সরকারি-বেসকারি প্রতিষ্ঠান বেশকিছু পাহাড় কেটেছে বলে স্বীকার করেছে বন বিভাগের কর্মকর্তারা। একই সাথে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।

সেভ দ্য নেচার বাংলাদেশ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কক্সবাজারের পাহাড় কাটা নিয়ে বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এই সংগঠনটির দাবি, ২০০৫ সালে কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনে প্রায় ৮ হাজার পাহাড় ছিল। দেড় দশকের ব্যবধানে সাড়ে ৩ হাজারের অধিক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। এখন চলছে পাহাড় কাটার প্রতিযোগিতা।

সেভ দ্য নেচার বাংলাদেশের এর চেয়ারম্যান আ.ন.ম. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এখনো রাতদিন রামুর ধোয়া পালং, খুনি পালংসহ কয়েকটি এলাকায় দেড়শো থেকে দুইশো শতাধিক ট্রাকে করে পাহাড় কেটে প্রতিদিন বিভিন্ন স্থানে মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে। একইভাবে কক্সবাজার শহরসহ পুরো জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতিযোগিতা করে পাহাড় কাটা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাবাড় করে ফেলা পাহাড়গুলোর ঘনফুট নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। দেখা গেছে, পাহাড়ের সামান্য অংশ বিশেষ সাবাড় করলে ১০ থেকে ২০ লাখ ঘনফুট হয়ে যায়। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ না থাকলে এভাবে প্রকাশ্যে পাহাড় কাটা সম্ভব নয়।

সরজমিন দেখা গেছে, সদরের খুরুশকুল, ঝিলংঝা, পিএমখালী, ইসলামপুর, ইসলামাবাদ, ঈদগাঁও, রামুর মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদ নগর, কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া, শহরের ফাতার ঘোনা, কলাতলী এলাকায় অসংখ্য পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে। এসব এলাকাগুলোতে এখনো পাহাড় কাটা চলছে।

জেলার শত শত মানুষ নির্বিচারে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ধুম পড়েছে কক্সবাজারে। এতে করে একদিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে পাহাড়ে বসবাসরত প্রাণীগুলো হারাচ্ছে নিরাপদ আবাসস্থল।

পাহাড় কাটা প্রতিরোধে এ পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ বিষয়ে সবসময় তাদের অবস্থান কঠোর ছিল, এখনো আছে।

অন্যদিকে রামু উপজেলার অবস্থা আরও ভয়াবহ। সরেজমিন দেখা গেছে, রামুর খুনিয়াপালং, ফতেখাঁরকুল, রশিদ নগর, কাউয়ারখোপ, মিঠাছড়ি, রাজারকুল, কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নেও শত শত পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী, ডুলাহাজরা, ফাঁসিয়াখালীর উচিতার বিল, নয়াপাড়া, মুসলিমনগর ইউনিয়নে শতাধিক পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে। পেকুয়া উপজেলার, শিলখালী, বারবাকিয়া এলাকায়ও শতাধিক পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া, হোয়ানক, ছোট মহেশখালী শাপলাপুর ইউনিয়নে ১০ থেকে ১৫ পয়েন্টে ২ শতাধিক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী, ডুলাহাজরা, ফাঁসিয়াখালীর উচিতার বিল, নয়াপাড়া, মুসলিমনগর ইউনিয়নে শতাধিক পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে। পেকুয়া উপজেলার, শিলখালী, বারবাকিয়া এলাকায়ও শতাধিক পাহাড় কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া, হোয়ানক, ছোট মহেশখালী শাপলাপুর ইউনিয়নে ১০ থেকে ১৫ পয়েন্টে ২ শতাধিক পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।

এ ছাড়াও উখিয়া উপজেলার, পালংখালী, থাইংখালী, জালিয়া পালং, রাজার পালং ইউনিয়নেও কাটা হয়েছে শতাধিক পাহাড়। এসব উপজেলায়ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও ড্রাম ট্রাকের মালিকের নেতৃত্ব পাহাড় কাটা চলছে। সেখানে পাহাড় কাটার দায়ে জরিমানা ও মামলা হচ্ছে। তারপরও পাহাড় কাটা থামানো যাচ্ছে না।

বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত ৩ বছরে শুধু উত্তর বন বিভাগের প্রায় ৫ শতাধিক পাহাড় কর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে সদরের খুরুশখুল ইউনিয়ন, পিএমখালী ও ইসলামপুরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। তবে বন বিভাগ পাহাড় কাটা রোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, বন বিভাগের সহযোগিতায় জেলা জুড়ে নির্বিচারে পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে। শুধু কক্সবাজার শহরেই উত্তরণ গৃহায়ন সমিতি একাই ৯৩ একর পাহাড় সাবাড় করেছে। ওই ৯৩ একরে শখানেক ছোট বড় পাহাড় ছিল। যেখানে বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, হরিণসহ ৩৬ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর দেখা মিলতো। এখন নিরাপদ আবাসন হারিয়ে এসব প্রাণীগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির ও উত্তরের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বন বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে পাহাড় কাটা হচ্ছে- এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দুইজনই জানান, বন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রতিদিন পাহাড় খেকোদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গত ১৫ বছরে সাড়ে ৩ হাজার পাহাড় কাটার বিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, বন বিভাগ হেক্টর হিসেব করে থাকে। তাই কতগুলো পাহাড় ছিল, কতগুলো পাহাড় সাবাড় করা হয়েছে বলা মুশকিল।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগের লোকবল সংকট, নানান বাধা-বিপত্তি আছে। অবৈধ ড্রাম ট্রাকগুলোর চলাচল বন্ধ করা গেলে পাহাড় কাটা বন্ধ করা সম্ভব বলে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আমিন আল পারভেজ বলেন, কক্সবাজার জেলায় কী পরিমাণ পাহাড় ছিল, কী পরিমাণ সাবাড় হয়েছে- এ ধরনের কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। হয়তো পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে এ তথ্য থাকতে পারে। তবে সময় নিয়ে মৌজা ভিত্তিক হিসেব করলে পাহাড়ের সংখ্যা বের করা যেতে পারে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, কী সংখ্যক পাহাড় কাটা হয়েছে সে পরিবেশ অধিদপ্তর এক মুহুর্তের জন্য বসে নাই। অনেক পাহাড়-খেকোর বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে। অবৈধ ড্রাম ট্রাকের কারণে পাহাড় কাটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অবৈধ ট্রাকের বিষয়ে অবগত করা হলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) রাকিবুল ইসলাম বলেন, শুনেছি, কক্সবাজারে হাজার হাজার অবৈধ ড্রাম ট্রাক আছে। অবৈধ ট্রাকগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা নেয়া হবে।