• আজ রবিবার। গ্রীষ্মকাল, ৫ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। ১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ। রাত ১১:৫৪মিঃ

কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনে পর্যটক ঠকাতে দালাল চক্র সক্রিয়!

১১:৪৪ অপরাহ্ন | রবিবার, মার্চ ১৪, ২০২১ চট্টগ্রাম
best westin-kader

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: দেশের শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে ছুটে আসা পর্যটকদের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে হোটেল মোটেল জোন কেন্দ্রিক একাধিক দালাল চক্র। তেমন একটি সক্রিয় দালাল চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে কক্সবাজার শহরের জামাত নেতা ফজলুল কাদের।

যাকে কমিশন কাদের নামেও চিনে শহরের পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। কক্সবাজার সেন্টমার্টিন ও এর আশপাশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে গড়ে উঠা সহস্রাধিক নামীদামী আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করেই মূলত কাদেরের চক্রটি পর্যটক ঠকানোর কাজ করে থাকে।

পর্যটকদের অসহায়ত্বকে পুজি করে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ হারে রুম ভাড়া দিয়ে আদায় করে নিচ্ছে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে নিজেদের রুম ভাড়ার স্বার্থে হোটেল কর্তৃপক্ষও কাদেরের মতো দালাল চক্রকে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সহযোগীতা করে আসছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারীর ভেতরেও জামাত নেতা কাদেরের দালাল চক্রটি কক্সবাজার শহরে হোটেল বুকিং বা ভাড়া দেওয়ার কথা বলে প্রতিদিন দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে এবং আদায় করে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা কমিশন। এভাবে চলতে থাকায় পর্যটকদের মধ্যে একধরণের নেতিবাচক ধারণ তৈরি হচ্ছে।

হয়রানির শিকার হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অসংখ্য পর্যটক। এক তথসূত্রে জানা গেছে- কক্সবাজার ভ্রমণ শেষে ফিরে যাওয়া সিংহভাগ পর্যটক দ্বিতীয়বার আর কক্সবাজারকে বেছে নেন না। অধিকাংশ পর্যটকেরই মন্তব্য- কক্সবাজারের সবখানেই গলাকাটা বাণিজ্য চলে। যে যেভাবে পারে পর্যটকের টাকাগুলো হাতিয়ে নেয়। হয়রানি করে নানা ভাবে।

জানা গেছে- গত ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা খিলক্ষেত থেকে স্বপরিবারে বেড়াতে এসেছিলেন ড. মুহিব আহমেদ শাহীন। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী। রয়েছেন লায়ন্স ক্লাব ঢাকা মহানগরীর সভাপতির দায়িত্বে। ঘটনাচক্রে তিনি উঠেছিলেন বেস্টওয়েস্টিন হোটেলে।

হোটেল ছেড়ে যাওয়ার দিন স্বাভাবিক ভাবেই মানি রিসিট ও ভ্যাট চালান চাইলে দিতে অস্বীকার করে হোটেল কর্তৃপক্ষ। আর এতেই বাঁধে গোলমাল। এরপর থেকে কেঁচো কুড়তে গিয়ে সাপ বের হয়ে আসতে শুরু করে।

ড. শাহীন প্রতিবেদককে জানান- হোটেলের স্বাভাবিক রুম ট্যারিফের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা আদায় করে নিয়েছে এমনটি সন্দেহ হলে তিনি হোটেল কর্তৃপক্ষের নিকট মানি রিসিট চান। তখন ওই মানি রিসিটটি বেস্ট ওয়েস্টিন কর্তৃপক্ষ তার হাতে না দিয়ে জনৈক কাদেরের নিকট হস্তান্তর করেন। এমনকি ভ্যাট চালান চাইলে সেটিও হোটেলের কাছ থেকে পাননি বলে দাবী করেন শাহীন। অন্যদিকে হোটেল কর্তৃপক্ষ বলছে ভ্যাট চালানটি সরবরাহ করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু ওই পর্যটক নিজেই নিয়ে যাননি।

দালালদের গডফাদার চিহ্নিত কমিশন খোর কাদেরের কাছে মানি রিসিট হস্তান্তরের কারণ জানতে চাইলে বেস্ট ওয়েস্টিন হোটেলের ফ্রন্টডেস্ক ম্যানেজার খান মো. জায়েদ প্রতিবেদকে বলেন- মি. শাহীন হোটেলের যে দুটি রুম ব্যবহার করেছেন তা মূলত আমাদের কাছে বুকিং দিয়েছে ফজলুল কাদের নামে একজন। অর্থাৎ আমাদের অতিথি হোটেলকে সরাসরি বুকিং দেননি।

তিনি জনৈক কাদেরের মাধ্যমে বুকিং দিয়েছেন। সে হিসেবে কাদেরই মানি রিসিট পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু অতিথির নিকট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি নজরে আনা হলে ম্যানেজার জায়েদ বলেন- সেটি কাদের নিয়ে থাকতে পারে। হোটেল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই অতিরিক্ত টাকা আদায়ের সুযোগ নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়- ফজলুল কাদের নিজেকে বেস্ট ওয়েস্টিনসহ বেশ কয়েকটি হোটেলের মালিক পরিচয় দিয়ে পর্যটকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেন। পর্যটকদের সামনে নানা ধরণের বিলাসী কথাবার্তা ও বক্তব্য ঝেড়ে কথা বলেন। এখানেই কুপোকাত হয় যেকোনো পর্যটক। সহজ সরল পর্যটক সরল বিশ্বাসে তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নেন।

এই সুযোগটিকেই কাজে লাগায় কাদের ও তার দলবল। ঘটনা চক্রে গত গত ৯ মার্চ সন্ধ্যায় একটি চায়ের দোকানে কাদেরের সহযোগি আব্দুল মালেক নুরীর সাথে পরিচয় ঘটে পর্যটক ড. শাহীনের। সেখানেই সেবা দেওয়ার কথা বলে শাহীনকে ফাঁদে ফেলেন আব্দুল মালেক নুরী। নুরী পর্যটক শাহীনকে জালে আটকানোর পর সরাসরি হস্তান্তর করে তার গডফাদার কাদেরের নিকট। অবশেষে শাহীনকে গুণতে হয় রুম ভাড়ার দ্বিগুণ টাকা।

বিষয়টি নিয়ে কাদেরের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন- হোটেলটির মালিক তিনি নিজেই। পর্যটকদের হয়রানি হয় এমন কোনো কাজ তিনি করতে পারেন না। তার ম্যানেজার মুজাহিদ এসব কাজ করেছে। পর্যটক শাহীনের বিড়ম্বনার দায় কার জানতে চাইলে তিনি সরাসরি তার ম্যানেজার পরিচয়ী অজ্ঞাত কোনো এক মুজাহিদের উপর দায় চাপান। অন্যদিকে কাদেরের অন্যতম সহযোগী মালেকের সাথে যোগযোগ করা হলে তিনি দাবী করেন- পুরো ঘটনাটি ঘটিয়েছে ফজলুল কাদের। এঘটনার সবকিছুর জন্য তিনিই দায়ী।

এব্যাপারে পর্যটক সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন- অভিযোগগুলো সরাসরি পর্যটকদের নিকট থেকে পেলে ব্যবস্থা নিতে একটি সুবিধা হয়। তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ভুক্তভোগী যদি ন্যূনতম মুঠোফোনেও তার সমস্যার কথা জানায় আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। এছাড়াও এবিষয়টি যেহেতু আগে কেউ অবগত করেনি; এখন আপনাদের মাধ্যমে জেনেছি। সুতরাং খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

কক্সবাজারকে পর্যটন বান্ধব করে গড়ে তুলতে আমরা দালাল চক্রগুলোকে চিহ্নিত করে খোঁজে বের করবো এবং শীঘ্রই আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।