‘চিকিৎসকরা ক্লান্ত, তাদের মনোবল বাড়াতেই নাচের ভিডিও তৈরি’

doctor
❏ বুধবার, এপ্রিল ২৮, ২০২১ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক- করোনাভাইরাস মহামারিতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় নেই চিকিৎসকদের। এমন পরিস্থিতিতে সহকর্মীদের মনোবল আরও দৃঢ় করতে একটি নাচের ভিডিও তৈরি করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের তিন চিকিৎসক। ইতিমধ্যেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে।

ভিডিওতে থাকা তিনজনই ঢামেকের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক। এদের মধ্যে ডা. শাশ্বত চন্দন গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার নিজের ফেসবুক ওয়ালে ভিডিওটি আপলোড করেন। মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।

মহামারিতে সহযোদ্ধাদের মধ্যে উষ্ণতা নিয়ে এসেছে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া তিন চিকিৎসকের নাচের এই ভিডিওটি। ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে নাচের আয়োজনটি করেছিলেন সার্জারি বিভাগের ইন্টার্ন ডা. শাশ্বত চন্দন, ডা. আনিকা শ্যামা ও সিনিয়র ডা. দীপা বিশ্বাস।

ভিডিওতে দেখা যায়, ঢামেক হাসপাতালের জেনারেল অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) করিডরে একজন পুরুষ ও দুইজন নারী চিকিৎসক মুখে মাস্ক দিয়ে সিলেট অঞ্চলের ভাষায় ‘নয়া দামান’ গানে নেচেছেন। তাদের এই ভিডিও দেখে ডাক্তারদের মধ্যে একটি উৎফুল্ল ভাব এসেছে।

ভিডিওটি নিয়ে কথা হয় ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. শাশ্বত চন্দনের সঙ্গে। কী মনে করে এই ভিডিও? প্রশ্নে প্রথমেই ডা. চন্দন বলেন, ‘আমি তো বুঝিনি। হঠাৎ করেই মাথায় এলো। কিন্তু এটা এত ভাইরাল হবে, বুঝিনি আমি।’

এরপর তিনি বলেন, ‘করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুর দিককার কথা। কেরালা, তারও আগে বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকদের নাচের ভিডিও বের হয়েছিল। তারা রোগীদের, নিজেদের উজ্জীবিত করার জন্য, নিজেদের মানসিক শক্তিকে আরও শক্তিশালী করার জন্য এই কাজগুলো করতেন। সেগুলো হাজার হাজার, লাখ লাখ শেয়ার হতে দেখেছি, তখন থেকেই মাথায় ছিল এরকম কিছু করা যায় কিনা। এরপর এই নাচের এই ভিডিও। সার্জারি বিভাগের করিডোর এটা, এখানেই ভিডিওটা করা।’

‘তারপরও বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা করে আপলোড করা। কিন্তু এটা যে এত ভাইরাল হবে, সেটা বুঝে আসে নাই’, বলেন চন্দন।

‘ভিডিও আপলোডের পর থেকে অনেক সেলিব্রিটি আমাকে ফেসবুকে রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছেন, আমি তো অভিভূত!’ চন্দনের বিস্ময়মাখা কণ্ঠ টের পাওয়া যায় ফোনের এ প্রান্ত থেকেও।

এটা কবে করেছেন জানতে চাইলে চন্দন বলেন, ‘২৬ এপ্রিল দিনের বেলাতে এই ভিডিও করা হয়। সন্ধ্যার দিকে এডিট করে পোস্ট করলাম। কিন্তু এর যে এত ভিউ হবে, আমার ভাবনাতেও ছিল না।’

ভিডিওতে চন্দনের সঙ্গে আরও দুজন ছিলেন। তাদের মধ্যে চন্দনের বন্ধু ডা. আনিকা ইবনাত শামা আর আরেকজন হচ্ছেন ডা. কৃপা বিশ্বাস। কৃপা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অনারারি মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

ভিডিওটা কি হঠাৎ করেই করা? জানতে চাইলে ডা. শ্বাশত চন্দন বলেন, ‘আমার ইন্টার্নির সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই সপ্তাহটাই সার্জারিতে শেষ সপ্তাহ। সে হিসেবে এই করিডোরে হয়তো আর আসা হবে না। সেই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যেটা কাজ করেছে, তা হচ্ছে-করোনার এই মহামারিতে গত প্রায় দেড়টা বছর ধরেই চিকিৎসকরা সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন। অনেক সিনিয়র চিকিৎসক মারা গেছেন, অনেক চিকিৎসকের পরিবারের সদস্য মারা গেছেন। হাজার হাজার চিকিৎসক করোনাতে আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু তাদের কোনও অ্যাপ্রিসিয়েশন নেই সেভাবে। কাজ করতে করতে চিকিৎসকরা এখন ক্লান্ত। অনেকেই মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। করোনা মানসিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে ফেলে। চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি, চিকিৎসকরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। এসব কিছু ভেবেই এটা করা। এই ভিডিও দেখে কোনও চিকিৎসক যদি একটু প্রফুল্ল হতে পারেন সেটাই আমাদের স্বার্থকতা।’

‘তবে ভিডিওটি আপলোড হওয়ার পর আমার শেয়ার করা ভিডিওতে দেশের পথিকৃত এমন স্যাররা (চিকিৎসক) কমেন্ট করেছেন যেটা আমি কোনোদিনও ভাবিনি। তারা উৎসাহ দিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, অভিনন্দন জানিয়েছেন।’ বলেন চন্দন।

নাচের জন্য এই গানটা বেছে নিলেন কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম ইংরেজি গানের সঙ্গে নাচবো। পরে সিদ্ধান্ত বদলে এই লোকগানটি বেছে নিলাম।’

তিন জন মিলে তো নাচলেন, কিন্তু ভিডিও কে করেছেন? জানতে চাইলো উত্তর এলো, ‘আমাদের এক ওয়ার্ডবয়। সে আমাদের চেয়ে বেশি আনন্দিত ছিল এটা নিয়ে।’

শ্বাশত চন্দন নিজের ওয়ালে ভিডিওটি শেয়ার করেছেন সোমবার সন্ধ্যায়। এক মিনিট ১৪ সেকেন্ডের ভিডিওটি একদিনের ব্যবধানে ভিডিওটি তিন হাজারের উপরে শেয়ার হয়েছে আর কমেন্ট করেছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ আর রিঅ্যাক্ট করেছেন প্রায় ৩৪ হাজারের বেশি মানুষ।

তবে কমেন্টগুলো পড়লেই বোঝা যায়, সেখানে চিকিৎসদের সংখ্যাই বেশি। তারা বলছেন, ‘ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের জন্য দোয়া এবং ভালোবাসা।

এর আগে গত ১২ এপ্রিল ভারতের কেরেলা রাজ্যে দুই মেডিক‌্যাল শিক্ষার্থীর নাচের ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঘৃণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে রাজ্যটির মেডিক্যাল শিক্ষার্থী নাভিন কে রাজাক ও জানাকি এম ওমকুমার ভিডিওটি পোস্ট করেন।

রিল ভিডিওটি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে লেখা হয়, ‘যদি মনে করেন ঘৃণা ছড়াবেন, তাহলে জেনে রাখুন আমরা তার প্রতিরোধ করব।’

হ্যাশট্যাগ দিয়ে রাসপুতিনচ্যালেঞ্জ নামের ওই ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হলে ভারতের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরাও একই রকম ভিডিও তৈরি ও পোস্ট শুরু করেন।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন