চাঁদপুরে ইলিশের আকাল, ঋণের বোঝা নিয়ে হতাশায় জেলেরা

❏ বুধবার, মে ৫, ২০২১ চট্টগ্রাম, দেশের খবর
jele

মাহফুজুর রহমান, চাঁদপুর: সরকারের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে দীর্ঘ দুই মাস পর ইলিশ শিকার করতে গিয়ে জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। নদীতে গিয়ে ইলিশ না পেয়ে চরম হতাশা নিয়ে ঘাটে ফিরছেন জেলেরা।

জেলেরা বলছেন, দীর্ঘ দুই মাসের ধার-দেনা ও ঋণ পরিশোধের স্বপ্ন নিয়ে ইলিশ শিকার করতে নদীতে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু নদীতে গিয়ে ইলিশ না পাওয়ায় হতাশা নিয়ে ফিরছেন।

জেলার নদীপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘুরে দেখা যায় কারো কারো জালে ছোট আকারের দু-চারটি ইলিশ ধরা দিচ্ছে। মিলছে অন্য প্রজাতির কিছু মাছও।

এর আগে গত মার্চ-এপ্রিল এই দুই মাস জাটকা সংরক্ষণে নদীতে সবধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা গত শুক্রবার (৩০ এপ্রিল) মধ্যরাতে শেষ হয়েছে। এরপরই মাছ ধরার জাল ও নৌকা নিয়ে দলবেঁধেই নদীতে নেমে পড়ে জেলেরা।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে গত শনিবার মধ্যরাতে ধার-দেনা ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নদীতে মাছ শিকারের নেমে পড়েন জেলেরা। কিন্তু নদীতে জাল ফেলে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলছেনা জেলেদের জালে। দুই মাসের ধার-দেনা, মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধ তো দূরের কথা ট্রলারের তেলের খরচও উঠছেন জেলেদের। সামনে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেলে দুর্ভোগ আরো বেড়ে যাবে।

ষাটনল এলাকার মাঝিসহ একাধিক জেলেরা জানান, আমরা ১০ জন জেলে প্রতিদিন ট্রলার নিয়ে প্রায় ৭ হাজার টাকা খরচ করে নদীতে যাচ্ছি। কিন্তু যে পরিমাণ মাছ পাই তা ৩-৪ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারি। এতে তেলের খরচও উঠেনি।

তারা আরও জানান, ভাবছিলাম অভিযানের পর নদীতে গিয়ে অনেক মাছ ধরে ধার-দেনা পরিশোধ করতে শুরু করমু। আমাদের দুঃখ দুর হবে কিন্তু তা আর হলো না। অভিযানের দুই মাস যে ধার-দেনা ও এনজিওর কিস্তির টাকা বাকি ছিল তা এখন পরিশোধ করমু কেমনে।

এদিকে, জেলা শহরের বড়স্টেশন পাইকারি মাছঘাটেরও অভিন্ন চিত্র। সেখানেও সুনশান নীরবতা চলছে। তবে মাছ ব্যবসায়ীরা আশায় বুক বেঁধে আছেন। কারণ, তাদের অনেকের আগাম টাকা দেওয়া আছে জেলেদের কাছে।

আড়তদাররা বলছেন, গত বছর এই সময় বড় স্টেশন ঘাটে অন্তত ২০০ মণের উপরে মাছ এসেছিল। সেখানে এ বছর মাত্র ৪০-৪৫ মণ এসেছে।

বড় স্টেশন মাছ ঘাটের আড়তদার কাজী ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, এক কেজি সাইজের ইলিশ মাছ ১৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে দুই একদিন পর যখন ভোলা বা বরিশাল থেকে মাছ আমদানি শুরু হবে তখন দাম কিছুটা কমবে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুল বাকী জানান, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোরতার মাঝেও জাটকা নিধন করেছে একশ্রেণির অসাধু জেলে। তবে তাদের সিংহভাগের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৪০ মেট্রিক টন জাটকা, ৪২ কোটি মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারের খাদ্য সহায়তা হিসেবে দুই মাসে প্রত্যেক জেলে পরিবারকে ৮০ কেজি হারে চাল দেওয়া হয়েছে।

দেশের অন্যতম মৎস্য বিজ্ঞানী, ইলিশ গবেষক ডা. আনিছুর রহমান বলেন, ‘ইলিশ পরিভ্রমণশীল মাছ। প্রতিনিয়ত চক্রাকারে স্রোতের বিপরীতে ঝাঁকবেঁধে চলে। সুতরাং জেলেদের অধৈর্য হলে চলবে না। একটু অপেক্ষা করতে হবে। বৃষ্টিপাত এবং পানির স্রোত বেড়ে গেলেই তখন কাঙ্ক্ষিত ইলিশ জালে পড়বে’।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ বলেন, এই জেলার প্রকৃত জেলে অর্থাৎ যারা বড় নদীতে ইলিশসহ সবধরনের মাছ শিকার করেন- এমন জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে তাদের প্রত্যেকের ব্যাংক হিসাব খোলা হবে। যাতে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বেকার হয়ে পড়া জেলেরা আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, এসব প্রান্তিক জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে এধরনের একটি প্রস্তাবতা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।