• আজ সোমবার, ৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ ৷ ১৪ জুন, ২০২১ ৷

শরীয়তপু‌রে কৃষিঋণ পেতে হয়রানি, ব্যাংকে দালাল চ‌ক্রের দৌরাত্ম্য চর‌মে!

Shariyatpur news
❏ রবিবার, মে ৯, ২০২১ ঢাকা

নয়ন দাস, শরীয়তপুর প্রতিনিধি: শরীয়তপু‌রের ডিএমখা‌লি‌তে কৃষি ব্যাংকের শাখা থে‌কে স্বল্প সু‌ধে ঋণ নিতে লাখে ১০/১২ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চললেও ভুক্তভোগীরা পান না কোন প্রতিকার। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। যদিও তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্য আঞ্চি‌লিক শাখা ব্যবস্থাপক ও স্থানীয় প্রশাসন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেদরগঞ্জ উপ‌জেলার ডিএমখা‌লি ইউ‌নিয়‌নে কৃষি ব্যাংকের শাখা থেকে উপজেলার কয়েক হাজার কৃষক নানা শস্যের ওপর কৃষিঋণ গ্রহণ করে থাকেন। বর্তমা‌নে এ শাখায় গ্রাহক সংখ্যা র‌য়ে‌ছে ২ হাজার ৮শ’ ৬জন, চ‌লিত অর্থবছ‌রে ঋণ বিতর‌নের টা‌র্গেট ধরা হ‌য়ে‌ছে ৯কো‌টি ৭০লাখ টাকা। কিন্তু বে‌শির ভাগ গ্রাহক দালাল চ‌ক্রের মাধ্য‌মেই ঋণ পে‌য়ে থা‌কে ব‌লে অ‌ভি‌যোগ দীর্ঘ‌দি‌নের। ব্যাংক কে‌ন্দ্রিক দালাল চক্রের সদস্যরা ব্যাংক কর্মকর্তা‌দের মাধ্য‌মে এলাকাভিত্তিক গ্রাহক সৃ‌ষ্টি ক‌রেন। প‌রে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা ব‌লে প্র‌তি লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ১০/১২ হাজার আর ৫০হাজারে ৫/৬ হাজার টাকা ঘুষ আদায় ক‌রে থা‌কেন। ঘু‌ষের টাকা আবার দালাল ও ব্যাংক কর্মকর্তারা ভাগবাটোয়ারা করে নি‌য়ে থা‌কে ব‌লে অভিযোগ অ‌নেক ভুক্তভু‌গীর।

ডিএমখা‌লি গ্রা‌মের কৃষক দাদন মিয়ার সংসার চ‌লে কৃ‌ষি কাজ ক‌রে। জ‌মি‌তে চাষাবাদ কর‌তে তার টাকার প্র‌য়োজ‌ন। টানাটা‌নির সংসা‌রে কৃ‌ষিঋণের জন্য গি‌য়ে‌ছি‌লেন ডিএমখা‌লি শাখার কৃ‌ষি ব্যাং‌কে। কিন্তু টাকার জন্য অ‌নেক ঘুর‌তে হ‌য়ে‌ছে দাদন মিয়ার। তি‌নি ব‌লেন, ঘুষ ছাড়া কোন লাভ হয় না ঐই ব্যাং‌কে। এরপর জান‌তে পা‌রি গ্রা‌মে গ্রা‌মে ব্যাং‌কের থে‌কে দালাল ফিট করা আছে। প‌রে দালা‌লের কা‌ছে গি‌য়ে শুন‌তে পা‌রি, প্র‌তি লা‌খে ১০/১২ হাজার টাকা লাগ‌বে। দালা‌লের মাধ্য‌মে আগে টাকা দি‌লে লোন পে‌তে কোন সমস্যা হয় না। আমরা কৃষকরা দালাল মুক্ত ব্যাংক চাই। দালাল‌ চ‌ক্রের নাম জান‌তে চাই‌লে ওই কৃষক জানান স্থানীয় প্রভাবশালী দলীয় লোকজন, তা‌দের নাম বল‌লে আমা‌দের ক্ষতি কর‌বে।

ব্যাংক সূ‌ত্রে জানা গে‌ছে, কৃষ‌কের ভাগ্য উন্নয়‌নে স্বল্প সু‌দে কৃষিঋণ, মু‌জিববর্ষ ও ক‌রোনাকালীন প্র‌ণোদনার ব্যবস্থা ক‌রে‌ছে সরকার। ত‌বে মাঠ পর্যা‌য়ে সরকা‌রি সু‌ভিধা পে‌য়ে ভোগা‌ন্তির শেষ নেই কৃষ‌কের। ঋণপ্রস্তাব থেকে শুরু করে টাকা পাওয়া পর্যন্ত পদে পদে দালাল ও ব্যাংক কর্মকর্তা‌দের দ্বারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন দরিদ্র কৃষক। ই‌তোম‌ধ্যে দালাল চ‌ক্রের সাথে জ‌ড়িত থাকার অ‌ভি‌যোগে এক লোন তদন্তকারী অ‌ফিসারকে বদলী করা হ‌য়ে‌ছে। এভাবেই ঋণের প্রায় এক‌টি অংশ প‌কে‌টে চ‌লে যায় দালালের মধ্যস্ততায়, কিন্তু ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পু‌রোটাকা প‌রিশোধ কর‌তে হয় খেটে খাওয়া কৃষকদের।

Pic-2

অভিযোগ রয়েছে, ডিএমখা‌লি ইউ‌নিয়‌নের তালতলা গ্রা‌মের স্থানীয় কৃষক‌দের ঋণ পে‌তে সকল কার্যক্রম ক‌রে থা‌কেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপ‌তি ফারুক সরকার। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ঋণের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তি‌নি। এরজন্য তাততলা বাজা‌রে তার নি‌জেস্ব এক‌টি অ‌ফিসও র‌য়ে‌ছে। এলাকাবাসীর কা‌ছে কৃ‌ষিব্যাং‌কের অ‌ফিস ব‌লেই প‌রি‌চিত। সকল কাগজপত্র নি‌য়ে ঐই ক‌থিত অ‌ফিসের মাধ্য‌মে ব্যাং‌কে গে‌লেই ঋণের টাকা হা‌তে পান গ্রাহক। ওই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপ‌তি ফারুক সরকার ব‌লেন, কোন লোক য‌দি আমার কা‌ছে এ‌সে সহ‌যো‌গিতা চায়, তাহ‌লে আমি তা‌কে সাহায্য ক‌রে থা‌কি। গ্রা‌মের মানুষ কাগজপত্র বু‌ঝে না। তাই সব কাগজপত্র ঠিকঠাক ক‌রে দেই। এরপর য‌দি ব্যাংক থে‌কে লোন দি‌তে না চায় তাহ‌লে বিষয়‌টি তি‌নি সমাধান ক‌রে থা‌কেন ব‌লে জানান।

সাম্প্র‌তিক ওই ব্যাং‌কের ঋণ বিতর‌নের এক‌টি তা‌লিকা ধ‌রে অনুসন্ধা‌নে দেখা যায়, গত ২৪ ফেব্রুয়ারী স্থানীয় দালাল চ‌ক্রের সদস্য আজহার সিকদার‌কে ভুল কাগজপত্রের মাধ্য‌মে কলা বাগানের জন্য ২লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ ‌দেওয়া হয়। য‌দিও কলা বাগা‌নের কোন অ‌স্তিত্ব নেই তার জ‌মি‌তে। ত‌বে এ‌নি‌য়ে ‌তি‌নি ক্যা‌মেরায় কথা বল‌তে না চাই‌লেও জা‌নি‌য়ে‌ছেন, ডিএমখা‌লি কৃ‌ষি ব্যাং‌কের শাখায় অ‌নেক দালাল চক্র র‌য়ে‌ছে। কৃ‌ষি ব্যাং‌কের লো‌ন নি‌লে অ‌নেক সু‌ভিধা আছে। ক‌খনো কৃ‌ষি ব্যাংক ‌কি‌স্তির টাকার জন্য কৃষক‌দের চাপ দি‌য়ে থা‌কেন না। এমন অ‌নেক সু‌ভিধা থাকায় গ্রাম পর্যা‌য়ে দালাল চক্র গ‌ড়ে ও‌ঠে‌ছে। ওই শাখা ব্যাং‌টির ভবন মা‌লিক থে‌কে শুরু ক‌রে ব্যাং‌ক স্টাফরাও অ‌নিয়‌মের সা‌থে জ‌ড়িত র‌য়ে‌ছে।আজাহার ছাড়াও গত ১৭ ফেব্রুয়ারী আক্তার হো‌সেন দেড়’লাখ টাকা ঋণ তুল‌লে ১২হাজার টাকা ঘুষ দি‌তে হ‌য়ে‌ছে। গত বছ‌রে শ‌হিদুল সরদার না‌মে অ‌রেক গ্রাহক ৫০হাজার টাকা লোন নি‌তে এ‌সে ব্যাং‌কের স্টাফ‌কে ১০হাজার টাকা ঘুষ দি‌য়ে‌ছেন ব‌লেও জানা গে‌ছে।

এভা‌বে বছ‌রের পর বছর অ‌নিয়ম ও দালাল চ‌ক্রের দৌরাত্ম্য চল‌লেও কোন ব্যবস্থা নেয়‌নি কৃ‌ষি ব্যাংক এর ডিএমখা‌লি শাখা ব্যবস্থাপ‌ক মোহাম্মদ হোসেন। ত‌বে অ‌নিয়‌মের বিষ‌য়টি অস্বীকার ক‌রে তি‌নি ব‌লেন, আমার সময়ে ব্যাং‌কে কোন অ‌নিয়‌ম হয়‌নি। এসব অ‌ভি‌যোগ সব মিথ্যা। বছর ক‌য়েক আগে এখা‌নে অ‌নেক দালাল ছি‌লো। কিন্তু এখন কোন দালালকে ব্যাং‌কে ঢুক‌তে দেওয়া হয় না।

এ‌বিষ‌য়ে বাংলা‌দেশ কৃ‌ষি ব্যাং‌কের শরীয়তপুর জেলার ১৯টি শাখার তদার‌কির দা‌য়ি‌ত্বে থাকা মুখ্য অঞ্চ‌লিক কার্যাল‌য়ের উপ-মহাব্যাবস্থাপ‌ক কাজী কামরুজ্জামান কা‌ছে জান‌তে চাওয়া হ‌লেও তি‌নি এ‌নি‌য়ে কোন কথা বল‌তে রা‌জি হয়নি। ত‌বে জা‌নি‌য়ে‌ছেন গ্রাহক হয়রা‌নি ব‌ন্ধে ওই ডিএমখা‌লি শাখার এক লোন তদন্তকারী অ‌ফিসার‌কে বদ‌লি করা হ‌য়ে‌ছে। এছাড়াও প্র‌য়োজ‌নীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দি‌য়ে‌ছেন এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

ভেদরগঞ্জ উপ‌জেলা নির্বাহী অ‌ফিসার তানভীর-আল-নাসীফ সম‌য়ের কন্ঠস্বর‌কে ব‌লেন, ব্যাং‌কের অ‌নিয়মের বিষয়‌টি আমা‌দের কা‌ছে কেউ জানায় নাই। য‌দি অ‌ভি‌যোগ পাই তাহ‌লে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হ‌বে। দালাল চ‌ক্রের সা‌থে যারা জ‌ড়িত কাউ‌কে ছাড় দেওয়া হ‌বে না। কৃ‌ষি ব্যাংক হ‌বে গণমানু‌ষের ব্যাংক।

নয়ন দাস