বাড়ি যেতেই হবে


❏ বুধবার, মে ১২, ২০২১ আলোচিত

সময়ের কন্ঠস্বর ডেস্ক: প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস মহামারীতে রুপ নিয়েছে। ভারতের অবস্থা ভয়াবহ। গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছে ৪২০৫ জন! করোনা নিয়ন্ত্রণে ঈদযাত্রা ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েনের পরও থামেনি ঘাটমুখী জনস্রোত। নগরীর গাবতলী, আমিনবাজার, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও টঙ্গী-আবদুল্লাহপুর এলাকা- সর্বত্রই ছুটে চলছে মানুষ।

এমনকি বিমানপথেও বেড়ে গেছে ব্যাপক চাহিদা। কেবল কমলাপুর রেলস্টেশন ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে-ই নেই সেই চিরচেনা চিত্র। গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকেই মানুষের পথচলা শুরু। উদ্দেশ্য- প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ উদযাপন। পথে পথে ভোগান্তিকে মাড়িয়েই তাদের ছুটে চলা। ফেরি চলাচল সীমিত করার সিদ্ধান্তও কাজে আসেনি। তাই বিধিনিষেধ শিথিল করে দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।

রাজধানীর গাবতলী ও আমিনবাজার এলাকায় বৃষ্টির মধ্যেও মানুষ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে গাড়ির সন্ধানে। বাড়ি থেকে অটোরিকশায় গাবতলী গিয়ে এবার আমিনবাজার পর্যন্ত হাঁটার চেষ্টা। উত্তরাঞ্চলের অনেক যাত্রী দেখা গেল ওই এলাকায়। কেউ কেউ প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাসে চড়ে বগুড়া, সিরাজগঞ্জে যেতে চান। লকডাউনের মধ্যেই অতিরিক্ত ভাড়ায় গাড়ি বদল করেই ছুটছেন গন্তব্যে। বাস, কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে চেপে দক্ষিণের যাত্রীরা যাচ্ছেন আরিচা-পাটুরিয়া ঘাটের দিকে।

প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। অন্যদিকে বাসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। তবে রাজধানীতে প্রশাসনের তৎপরতায় যাত্রীদের গাবতলী থেকে হেঁটে আমিনবাজার গিয়ে ধরতে হচ্ছে সেসব গাড়ি। কষ্টগুলো কাঁটার মতো বিঁধলেও দিনে শেষে যেন উৎসবের আনন্দ। বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজা সূত্র জানায়, সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১ হাজার যানবাহন পারাপার হয়েছে সেতু দিয়ে। এ সময় টোল আদায় করা হয়েছে দুই কোটি ৫৬ লাখ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ১২ থেকে ১৩ হাজার যানবাহন চলাচল করে এই সেতু হয়ে।

ইকুরিয়া এলাকায় সকাল সাড়ে ৭টায় দেখা হলো ব্যাগ নিয়ে হেঁটে চলা চার তরুণের একটি দলের সঙ্গে। তারা জানালেন সোমবার সারা রাত ট্রাকে চেপে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছেন, যাবেন মাদারীপুর। তাদের মধ্যে একজন আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘ট্রাকে এক হাজার ৯০০ টাকা ভাড়া দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেমেছি। এর পর কোনো যানবাহন না পেয়ে ব্যাগ নিয়ে হেঁটেই এগোই কিছু দূর। পরে একটি খালি সিএনজি অটোরিকশা পেলে চালক জানান, আবদুল্লাহপুর টোলপ্লাজা পর্যন্ত যেতে পারবেন তিনি। আর ইকুরিয়া থেকে সামান্য ওইটুকু পথের ভাড়া চাইলেন ৪০০ টাকা। অনেক অনুনয় করেও ভাড়া কমাতে পারলাম না।’ ওয়াহাব বললেন, ‘এক হাজার ৯০০ টাকা দিয়া ট্রাকে আইসি, এখন আরও ১০০ টাকা বাড়তি লাগব জনপ্রতি। বাড়িত যাইতে শেষ পর্যন্ত কত টাকা খরচ হয় আল্লাই জানেন।

সকাল পৌনে ৮টার দিকে আবদুল্লাহপুর টোলপ্লাজায় পৌঁছে দেখা গেল, সব গাড়ি ঘুরিয়ে দিচ্ছেন বিজিবি সদস্যরা। সেখানে বাধা পাওয়া ব্যক্তিগত গাড়ির জটলা। আনিস নামের একজন বলেন, ‘আসলে রাজধানী ঢাকায় যারা থাকেন, তাদের বেশিরভাগেরই এখানে কাজের স্বার্থে থাকেন। তাই ঈদে তারা গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ জন্যই ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে চলে যেতে চান।’

গাজীপুরের রাস্তায় অন্যবারের মতো এবার আর যানজট নেই। তার বদলে আছে জনজট। দূরপাল্লার গাড়ি না থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারা অপেক্ষা করেন ‘কোনো একটা উপায় হবেই’ সে আশায়। গতকাল সকালে চন্দ্রা এলাকায় দেখা গেছে, এক পরিবারের কয়েকজন সদস্য টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দিকে হাঁটছেন। সামনের দিকে আগাচ্ছেন গাড়ি পাওয়ার আশায়। তাদের একজনের নাম রাসেল মিয়া। পরিবার নিয়ে গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকায় থাকেন তিনি। কাঁচামালের ব্যবসা করা রাসেল বলেন, ‘গাড়ি সংকটের কথা চিন্তা করে আগভাগেই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যেতে ভোর থেকে চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আছি। ১০টার দিকেও কোনো গাড়ি পাইনি। বিকল্প কোনো গাড়ি পাওয়া যায় কিনা সেই আশায় একটু সামনে যাচ্ছি।’ কীভাবে যাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা উপায় হয়ে যাবে। বাস যদি না পাই তা হলে ট্রাকে উঠে চলে যাব। যত কষ্টই হোক, বাড়িতে গিয়ে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করব, এর চেয়ে অন্য কোনো আনন্দ নেই। হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। করোনা ভাইরাসে ভয় করি না, যা হয় হবে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে ঈদ সামনে রেখে শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ঢল ঠেকাতে শনিবার রাতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে পুলিশ-বিজিবির রাস্তায় থাকলেও চেকপোস্টগুলোর দুপাশেই গাড়ির জটলা। বাধা পাওয়া মাত্রই মানুষ গাড়ি ছেড়ে হেঁটেই চেকপোস্ট পেরিয়ে ওপাশের অপেক্ষমাণ গাড়িতে গিয়ে উঠছে। মোটরসাইকেলে করে প্রচুর মানুষকে ঘাটের দিকে যেতে দেখা গেল। এক একটি মোটরসাইকেলে যাত্রী হিসেবে নারীদের সঙ্গে একাধিক শিশুকেও দেখা যায়। অনেক মোটরসাইকেলে ব্যাগ-বস্তার সঙ্গে ঝুলে থালা-বাসন, বঁটি, শিশুদের রঙিন খেলনা, পানির বোতল, টিফিন ক্যারিয়ারও।

সাড়ে ৮টার দিকে আবদুল্লাহপুর ফেরিঘাট থেকে কিলোমিটারখানেক দূরে সিরাজদিখান গোডাউন বাজার এলাকায় আসতেই সাইড রোডে দেখা গেল বিশাল জটলা। টোলপ্লাজা পেরিয়ে মানুষের স্রোত এই বাজার থেকে ট্রাক এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা উঠছে। এর মাঝেই পুলিশ এসে কয়েকটি গাড়ির চাবি নিয়ে গেল। রাস্তার ওপর গাড়িগুলো আটকে পড়ায় সামনে-পিছে বিশাল জটলা তৈরি হয়ে গেছে। চলছে হইচই, চিৎকার, ঠেলাঠেলি। হেঁটে টোলপ্লাজা পেরোতেই শোনা গেল চিরচেনা হাঁকডাক ‘মাওয়াঘাট, মাওয়াঘাট, দুশ দুশ।

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কাজে যে ‘ডাম্পট্রাকগুলো’ ব্যবহৃত হতো, সেগুলো এখন যাত্রী বহন করছে। ট্রাকগুলোর চালক ও সহকারীরা ডাকাডাকি করছেন; কেউ চাইছেন ১০০, কারও দাবি ২০০। এত ভাড়া কেন চাইছেন, জানতে চাইলে পিকআপচালক মোহাম্মদ সোহেল যাত্রীদের বলেন, ‘মহাসড়ক হয়ে গেলে ঘাটের ৫ কিলোমিটার আগেই নামিয়ে দেবে পুলিশ। আমি গ্রামের ভেতরের রাস্তা দিয়ে একেবারে ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাব। সে জন্যই ২০০ টাকা দিতে হবে।

এদিকে ফেরিতে মানুষের ঢল থামাতে বিজিবি মোতায়েন করা হলেও বাড়িফেরা মানুষদের ঢলের কাছে তাদের কিছুই যেন করার নেই। বিজিবির বাধা সত্ত্বেও জোর করে ফেরিতে উঠে যাচ্ছেন যাত্রীরা। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে গতকাল ১৪টি ফেরি চলাচল করেছে। আর এসব ফেরিতে রোগী ও লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স, পিকআপ, প্রাইভেটকার এবং পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে শতশত যাত্রী পার হয়েছেন। বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পর নৌরুটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় শিমুলিয়াঘাটে যাত্রী পারাপারে ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে বলে জানান বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়াঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ। তিনি জানান, এই নৌরুটে স্বাভাবিকভাবেই ফেরি চলাচল করেছে। তবে যাত্রী ও যানবাহন পারাপারে ফেরিতে কিছুটা চাপ তো থাকেই। গতকাল তিনটি রো-রো ফেরি, পাঁচটি ডাম্প ফেরি ও ছয়টি কে-টাইপ ফেরি চলাচল করেছে।

বরিশালগামী রোকেয়া ও সুজন দম্পতি বলেন, সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে ঢাকা থেকে ঘাটের উদ্দেশে রওনা হই। ঘাটে আসার পথে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তিনটা গাড়ি পরিবর্তন করে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে আসছি এখানে। তবে এখন অনেক খুশি লাগছে ফেরিতে উঠতে পেরে। ভাবছিলাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে ঘাট এলাকায়। তবে ঘাটে এসে এক মিনিটও অপেক্ষা করতে হয়নি। এখন ফেরি পার হতে পারলেই হবে। রকিবুল আহসান নামে এক যাত্রী বলেন, ‘গত বছর ঢাকায় ঈদ করেছি। আমার মা বৃদ্ধ। তাই মায়ের কাছে যাচ্ছি ঈদ করার জন্য। প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে আসছি ঘাটে। পুলিশ গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি।’ রহিমা খাতুন বলেন, ‘এভাবে ফেরি চলাচল করলে আমাদের আর ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। তবে গণপরিবহনে যদি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলের অনুমতি দিত সরকার, তা হলে আমাদের এতটা কষ্ট করে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে চলাচল করতে হতো না।

বিআইডব্লিউটিসি শিমুলিয়াঘাটের টার্মিনাল ইনচার্জ আল ফয়সাল বলেন, ‘শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের বহরে থেকে থাকা ১৭টি ফেরির মধ্যে বর্তমানে ১৫টি চলাচল করছে। যাত্রী ভোগান্তি লাঘব ও পণ্যবাহী যানবাহন পারাপারে গেল সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে এ নৌরুটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয় বিআইডব্লিউটিসি। সে নির্দেশে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ হিলাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিনের মতোই ঘাটে যাত্রীর চাপ রয়েছে। তবে ১৫টি ফেরি চলাচল করায় যাত্রীদের ঘাটে অপেক্ষা করতে হয় না। আমার ঘাটে ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রেখেছি। যাত্রী, অ্যাম্বলেন্স, পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ ও লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে কোনো গাড়ি এলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি যেতে দেওয়া হচ্ছে না।