ইয়াসের ধাক্কায় বিধ্বস্ত কক্সবাজারের উপকুল, সহায় সম্বলহীন বহু মানুষ

Cox's Bazar news
❏ শুক্রবার, মে ২৮, ২০২১ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: পূর্ণিমা ও ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বিধ্বস্ত হয়ে কক্সবাজার জেলায় প্রায় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে জেলায় ২ হাজার ৫৭০ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে জেলা প্রশাসন।

এ ছাড়া পূর্ণিমার প্রভাবে নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এখনও জেলার কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে তাদের জীবন পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি এই সব মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার কথা বলা হলেও এখনও ত্রাণ পায়নি হাজারো মানুষ। অর্ধহারে অনাহারে অনেকটা মানবতর দিন কাটছে তাদের।

অন্যদিকে বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে পানি ঢুকে পরায় তলিয়ে গেছে শত শত পুকুর ও অর্ধশাতিক মাছের ঘের। যদিও জেলা প্রশাসক বলছেন ক্ষতি নিরুপণের কাজ চলমান আছে এবং শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা করা হবে। ঝড়ের প্রভাবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে সেন্টমার্টিনসহ উপকূলের বেশির ভাগ এলাকায় এখন ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন। ঘরবাড়ি, মাছের ঘের, দোকান-পাট আর গবাদি পশু হারিয়ে অনেকেই এখন দিশেহারা। পানিবন্দি হয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন অনেকে। সাগর উপকূলের মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশী। অনেকের ঘরে ঠিকমত রান্নাও হচ্ছে না। জীবন বাঁচাতে অনেকে সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় নিলেও তারা হারিয়েছেন সহায় সম্বল।

মাতারবাড়ী ইউনিয়নের মায়েশা বেগম বলেন, আমাদের খোঁজখবর কেউ রাখেনা। গত দুইদিন ধরে পানির সাথে যুদ্ধ করে টিকে আছি। পানি উঠলে আমাদের কষ্টের শেষ নাই। রান্না করতে পারি না, খাইতো পারি না। বাচ্ছাদের অনেক কষ্টের মধ্যেই আছি। বানের পানিতো আমাদের ঘর নিয়ে গেছে। এখন ঘর কেমনে ঠিক করবে সন্তানদের নিয়ে কোন জায়গা থাকবো সেই চিন্তায়ও বাঁচি না। শুধু আমি না আমাদের মতো অনেক মানুষের ঘর দুয়ার পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, মাথা গোজানোর মতো জায়গা নেই। এখন সরকার যদি আমাদের দিকে চায় তাহলে আমাদের কিছুডা রক্ষা হবে।

মায়েশার মতো একই অবস্থা মহেশখালীর কয়েকশ পরিবারের। ঘূর্নিঝড় ইয়াসের প্রভাবে প্রচণ্ড বাতাস ও তীব্র পানির চাপে ঘরের মাটি নরম হয়ে ঘর পড়ে গেছে। এখন খোলা আকাশের নিচে জীবন কাটাছে সেখানকার হাজারো মানুষ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ছাড়া তেমন কিছুই জোটেনি তাদের ভাগ্যে।

সেন্টমার্টিনের বিধ্বস্ত ঘরের মালিক আলী আহাম্মদ বলেন, নদীর পারে থাকি আমরা। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এমনেই বসে থাকছি। তার উপর তুফানে বাড়িটা ফেলে দিল। বউ-বাচ্ছা নিয়ে কোথায় থাকবো। টাকা নেই, ঘর যে আবার নতুন করে করবো।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ রশিদ বলেন, প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসন ২ হাজার ৫৭০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত তালিকা নয়। এ তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে বাড়তেও পারে, আবার কমতেও পারে। এরমধ্যে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা তথ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীর, ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের বেড়িবাঁধ ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তবে সবচেয় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলায়।

স্থানীয়রা জানায়, মঙ্গলবার রাত থেকেই বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সকাল পর্যন্ত নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো তলিয়ে গেছে। পরদিন সকাল হতেই অধিকাংশ এলাকাই প্লাবিত হয়েছে। এইসব এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে হু হু করে পানি প্রবেশ করাই তারা কিছুই রক্ষা করতে পারেনি।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচতে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১১ হাজার ৬০০ মানুষ আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদেরকে জেলা প্রশাসনের উদ্যােগে পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়াও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজন মোতাবেক খাবার সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে মহেশখালীর মাতারবাড়ি, ধলঘাট ও সদরের পোকখালী, চৌফদন্ডীর ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধগুলোতে দ্রুত মেরামত করা না হলেও জোয়ারের পানিতে আরও বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশংকা করেছেন স্থানীয়রা। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিরা।

জানতে চাইলে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, পূর্ণিমা ও ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে মহেশখালীর মাতারবাড়ি, ধলঘাটা ও সদর উপজেলার পোকখালী, চৌফদন্ডীতে ১৪টি বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। তার মধ্যে ৩টি বেড়িবাঁধ আপাতত বাঁধ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি ১১টা বেড়িবাঁধে জোয়ারের পানি কমে গেলে সংস্কারের কাজ শুরু হবে।

এ ছাড়াও জেলার প্রায় বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত সব বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কার করা হবে বলে জানান কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী।

এদিকে কুতুবদিয়া ও মহেশখালী ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক।