চাটমোহরে সেচ মালিকদের শোষণের শিকার অসহায় কৃষকরা

news photo
❏ বুধবার, জুন ৯, ২০২১ রাজশাহী

আব্দুল লতিফ রঞ্জু, পাবনা প্রতিনিধি- পাবনার চাটমোহরে কৃষকের কষ্টার্জিত জমির ধানের একটি বড় অংশ সেচ মালিকরা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিয়ে নিচ্ছে। সেচ মালিকদের নির্ধারন করে দেওয়া চার্জের দ্বিগুনেরও বেশি ধান কৃষকের জমি থেকেই কেটে নিচ্ছে সেচ মালিকের লোকেরা। বছরের পর বছর হাজার হাজার কৃষককে ঠকিয়ে আসলেও এ নিয়ে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই, নেই কোন প্রতিকার। কৃষক বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ করলেও পাচ্ছে না সুফল। এ নিয়ে কৃষকের সাথে সেচ যন্ত্রের মালিকপক্ষের প্রায়শই বাক বিতন্ডার সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা গেছে, চাটমোহরে বিএডিসির পানাসী প্রকল্পের অধীনে ৭০টি এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষের অধীনস্ত ৫৭ টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি নলকূপ বিভিন্ন কারণে বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা ১০৪ টি গভীর নলকূপের মালিকপক্ষ উপজেলা সমন্বয় ও সেচ কমিটির সভার সিদ্ধান্ত না মেনে, সেচ চার্জ বাবদ টাকা না নিয়ে কৃষকের নিকট থেকে চার ভাগের এক ভাগ, কোথাও পাঁচ ভাগের এক ভাগ হিসেবে ধান নিয়ে বছরের পর বছর হাজার হাজার কৃষককে ঠকিয়ে আসছেন। গ্রামের দরিদ্র কৃষক জেনে অনেকে না জেনে অতিরিক্ত ধান নেওয়ার বিষয়ে প্রতিবাদ করেও কোন ফল পাচ্ছেন না বলে অনেক কৃষকের অভিযোগ।

২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী উপজেলা সমন্বয় ও সেচ কমিটির সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সভাপতি উপজেলা সমন্বয় ও সেচ কমিটি সৈকত ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি ইরি/বোরো মৌসুমে ১৯০০ টাকা, আমন মৌসুমে ১০০০ টাকা, উভয় মৌসুম একত্রে ২৯০০ টাকা, অগভীর নলকূপের ক্ষেত্রে বিঘা প্রতি প্রতি ইরি/বোরো মৌসুমে ১৯৫০ টাকা, আমন মৌসুমে ১০০০ টাকা, উভয় মৌসুম একত্রে ২৯৫০ টাকা, রবি মৌসুমে রসুন, গম, পিয়াজ ইত্যাদি আবাদে বিঘা প্রতি তিনটি সেচের ক্ষেত্রে ১০০০ টাকা এবং চারটি সেচের ক্ষেত্রে ১৩০০ টাকা সেচ চার্জ ধার্য করা হয়।

কিন্তু কাগজ কলমে এ সিদ্ধান্ত থাকলেও বাস্তবে চাটমোহরের গভীর ও অগভীর নলকূপ মালিকরা এ সিদ্ধান্ত না মেনে অধিকাংশ কৃষকদের নিকট থেকে চার ভাগের এক ভাগ ধান আদায় করে নিচ্ছেন। বিঘা প্রতি ২৪ মন ধান হলে গভীর নলকূপ মালিকরা পাচ্ছেন ৬ মন ধান যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার টাকা। কয়েকটি গভীর নলকূপের মালিক পক্ষ পাঁচ ভাগের এক ভাগ ধান নিচ্ছেন। সেসব ক্ষেত্রেও ঠকছেন কৃষক।

উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়নের জগতলা গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেন জানান, চলতি বছরে আমি ৪ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ও প্রায় ৬ বিঘা জমি নিজে ইরি-বোরা ধান আবাদ করেছি। চৌধুরী বিল, কলমিগাড়া বিল ও সোলাগাড়া বিলে এই ধান ফলাতে আমাকে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। ধান পাকার পরে যখন কেটে ঘরে তুলবো তখন বিঘা প্রতি সেচ পাম্পের মালিকরা সিকি ভাগ অর্থাৎ চার ভাগের এক ভাগ ধান জমি থেকে কেটে নিচ্ছে। অনেক বারন করেছি ধান একটু কম নিতে, তারা কোন কথাই কানে নেয়না।

বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী ফারুক আহম্মেদ জানান, বিএডিসির পানাসী প্রকল্পের অধীনে ৭০টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি চলমান রয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকা, ট্রান্সফরমার চুরি হয়ে যাওয়া, মালিকগন ইচ্ছা করে আবাদ না করা অথবা গভীর নলকূপ এলাকার কৃষকেরা অন্য ফসলের আবাদ করার মতো কারণে ২০টি গভীর নলকূপ বন্ধ রয়েছে। প্রতিটি গভীর নলকূপের আওতায় ৬০ একর বা এর কিছু কম বেশি জমি রয়েছে। কৃষকের নিকট থেকে সেচ মালিক পক্ষের ধান নেওয়ার কোন বিধান নেই। কৃষক অনেক সময় নগত টাকা দিতে পারেনা বলে তারা ধান দিয়ে থাকে। তবে সেটাও নিয়ম বহির্ভূত ভাবে অতিরিক্ত ধান নেওয়া যাবেনা।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন জানান, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষের অধীনস্ত চাটমোহরের ৫৭টি গভীর নলকূপের মধ্যে ৫৪টি সচল রয়েছে। মালিক পক্ষ প্রিপেইড সিস্টেমে প্রতি ঘন্টায় ১১০ টাকা খরচ করে গভীর নলকূপ গুলো চালান। প্রথম ১ হাজার ঘন্টা চালানোর জন্য অপারেটরকে ঘন্টা প্রতি দশ টাকা এবং উদ্বৃত্ত যত ঘন্টা চালানো প্রয়োজন হয় তার জন্য অপারেটরকে ১২ টাকা ঘন্টা হিসেবে টাকা দেয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষ। প্রত্যেকটি গভীর নলকূপের অধীনে সাধারণত ৬০ একর জমি থাকে। পানির অপচয় রোধে ২ হাজার ফিট বা তার চেয়েও বেশি আন্ডার গ্রাউন্ড পাইপ লাইন স্থাপন করে দেয়া হয়। আমাদের যেহেতু প্রিপেইড সিস্টেম সে ক্ষেত্রে কৃষকের নিকট থেকে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়াও কোন সুযোগ নেই।

চাটমোহর উপজেলা সমন্বয় ও সেচ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈকত ইসলাম বলেন, গত ২৫ ফেব্রুয়ারী উপজেলা সমন্বয় ও সেচ কমিটির সভায় সেচ চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন গভীর-অগভীর নলকূপ মালিক পক্ষ সভার সিদ্ধান্ত অমান্য করে অতিরিক্ত টাকা আদায় অথবা টাকা না নিয়ে কৃষককে ধান দিতে বাধ্য করতে পারেন না। কোন গভীর-অগভীর নলকূপ মালিক পক্ষ অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে, ধান দিতে বাধ্য করছে কৃষকের এমন অভিযোগ পেলে এবং সে অভিযোগ সত্য হলে নলকূপের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।