• আজ মঙ্গলবার, ১৯ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ৩ আগস্ট, ২০২১ ৷

ফুলবাড়ীতে চুলের ক্যাপ বানিয়ে সফল উদ্যোক্তা লাইজু

news photo
❏ শনিবার, জুন ১২, ২০২১ রংপুর

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি- কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে বাণিজ্যিকভাবে মাথার চুল দিয়ে ক্যাপ তৈরী করে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন নিভৃত পল্লীর এক নারী উদ্যোক্তা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লাইজু খাতুন নিজেই সাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গরীব-অসহায় পরিবারের শতাধিক নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। চুলের ক্যাপ দেশ-বিদেশে রপ্তানির সুযোগ থাকায় ইতিমধ্যেই গ্রামের গরীব-অসহায় পরিবারের ৩০ জন নারীদের দিয়ে চুলের ক্যাপ তৈরী করছেন উদ্যোক্তা লাইজু খাতুন। এই নারী উদ্যোক্তা লাইজু খাতুনের উদ্যোগে ৩০ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হওয়ায় প্রতি মাসে ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় করে তাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরেছে। সরকারী-বেসরকারী ভাবে আর্থিক সুবিধা পেলে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে অবহেলিত এলাকার শতশত নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে জানান ঐ নারী উদ্যোক্তা।

লাইজু কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার চন্দ্র খানা বালাতাড়ি গ্রামের কৃষক হেছার আলী মেয়ে। তার পাঁচ মেয়ে। অনেক কষ্টে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে। বড় তিন মেয়ের অভাবে কারণে পড়ালেখা করতে না পারলেও অনেক কষ্টে চতুর্থ মেয়ে লাইজু খাতুন অনার্স -মার্স্টাস ও সব ছোট মেয়েকে এসএসসি পাশ করিয়েছেন। লাইজু খাতুন পরিবারের সকল দারিদ্রতাকে জয় করে ২০১০ সালে এসএসসিতে জিপিএ ৪.১৯, ২০১২ সালে এইচ এসসিতে ৪.৭০ ও সর্বশেষ ২০১৬ সালে রংপুর সরকারী কলেজে বাংলা বিভাগ থেকেই অনার্স ও মার্স্টাস (এম.এ) প্রথম স্থান অধিকার করে।

২০১৫ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী একই উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের সোনাইকাজী গ্রামের আজিজার রহমানের ছেলে সামিউল ইসলাম সেলিমের সঙ্গে পারিবারিক ভাবে বিবাহ সম্পূর্ণ হয়। তার স্বামী একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে। তার আড়াই বছরের একটি কন্যা সন্তান আছে।

কর্মরত মোসলেমা বেগম (৩০) জানান, লাইজু আপার মাধ্যমে আমার মতো অনেক নারী ’সিনহা বিনতা সামিউল হেয়ার ক্যাপ নিটিং লিঃ প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাই। মাসে ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এখন পরিবারের স্বচ্ছলতা এসেছে।

কাকলী খাতুন নবম শ্রেণী ও আনিছা আক্তার অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী লাইজুর প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন। তারাও পড়ালেখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দ্বাড়ানো স্বপ্ন দেখছেন বলে জানান।

লাইজুর স্বামী সামিউল ইসলাম সেলিম জানান, লাইজু খুবেই মেধাবী একজন নারী। সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরেও সে কোন চাকুরি করবেন না। তার ইচ্ছা সে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে নিজে সাবলম্ভী হওয়ার পাশাপাশি গ্রামের অবহেলিত নারীদের সাবলম্ভী করে তুলবেন। তাই স্বামী হিসাবে স্ত্রীর স্বপ্ন পুরনের লক্ষ্যে তাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছি। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋন ও কিছু জমানো অর্থ দিয়ে ৩০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও বিভিন্ন কাঁচামালসহ এ যাবদ খরচ হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। আমার স্ত্রী যেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে আশা করছি প্রতিষ্ঠানটি টেঁকানো সম্ভব। স্ত্রী লাইজুসহ প্রতিষ্ঠানের ৩০ নারীর জন্য সাফল্য কামনা করছি।

উদ্যোক্তা লাইজু খাতুন জানান, আমরা অনেক দিনের ইচ্ছা ও স্বপ্ন একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে গ্রামের নারীদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করবো। এই স্বপ্নটা পুরণ করতে আমার স্বামীর সহযোগীতায় ময়মসিংহে ৫ দিন ও ঢাকা উত্তরায় ১০ দিনসহ মোট ১৫ দিন চুল দিয়ে ক্যাপ তৈরীর প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামের ৩০ জন নারীকে আমার নিজস্ব অর্থায়ণে ২০ থেকে ২৫ দিন ক্যাপ তৈরীর প্রশিক্ষণ দিয়ে বাবার বাড়ীতে একটি টিনসেট ঘরে স্বপ্ল পরিসরে ”সিনহা বিনতে সামিউল হেয়ার ক্যাপ নিটিং লিঃ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করি। এখন আমার প্রতিষ্ঠানে গত আড়াই থেকে তিন মাস ধরে চুলের ক্যাপ উৎপাদন হচ্ছে। ঢাকার একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমে এই চুলের তৈরী ক্যাপগুলো ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছি। তারা আমাদের তৈরীকৃত চুলের ক্যাপ চীনে রপ্তানি করছে। নিজে সাবলম্ভী হওয়ার পাশাপাশি গ্রামের অবহেলিত গরীব-অসহায় নারীদের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরেছে।

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা.সোহেলী পারভীন জানান, এটা খুবই ভাল উদ্যোগ। নারীরা সমাজে সু-প্রতিষ্ঠিত হোক সকলের চায়। দুই একদিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে লাইজুর প্রতিষ্ঠানটি সমিতির অন্তভুক্তির মাধ্যমে রেজিষ্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হলে উপজেলার শতাধিক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আমার বিশ্বাস।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমন দাস জানান, ফুলবাড়ী উপজেলার প্রত্যান্ত অঞ্চলে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই ইতিবাচক। এভাবেই নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরী হলে দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই নারী উদ্যোক্তাকে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা করা হবে। যাতে লাইজুর মতো অনেকেই দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে আসতে পারে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন