• আজ সোমবার, ১৮ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ২ আগস্ট, ২০২১ ৷

কালের গর্ভে হারিয়েই যাচ্ছে অগ্রজ প্রজন্মের প্রিয় ‘কুতকুত’ খেলা !

কুতকুত খেলা
❏ শুক্রবার, জুন ২৫, ২০২১ প্রজন্মের ভাবনা, স্পট লাইট

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ )প্রতিনিধিঃ ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার মেয়েদের এক সময়ের জনপ্রিয় খেলা ‘কুতকুত’।

দিনের পর দিন গ্রামাঞ্চল ঘুরলেও এখন আর সচরাচর চোঁখে পড়েনা মেয়েদের সেকালের সেই গ্রামীণ খেলা ‘কুতকুত’। ত্রিশালে মাত্র একযুগ পূর্বে কুতকুত খেলাটি ছিল ব্যাপক পরিচিত। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে খেলাটি এখন যেন সম্পূর্ণ অপরিচিত।

অথচ ত্রিশাল উপজেলার প্রতিটি পাড়া মহল্লার মেয়েরা একসময় কুতকুত খেলায় প্রচুর পারদর্শী ছিল। উঠানে শস্য শুকাতে দেয়ার ফাঁকে কিংবা বিকালের নরম আলোয় গৃহের আঙ্গিনায় কৈশর পেরোনো মেয়েরা কুতকুত খেলায় মেতে উঠতো।

বর্ষার পরের নরম মাটিতে মাটির ভাঙ্গা তৈজসপত্রের অংশ দিয়ে দাগ কেটে কুতকুতের জন্য ঘর বানিয়ে খেলা শুরু করে দিতেন। জানা যায়, কুতকুত খেলার শুরুতে আয়তক্ষেত্রাকার মোট ৭/৮টি ঘর আঁকা হয় এবং এই ঘরগুলোর শেষ মাথায় অর্ধচন্দ্রাাকৃতির আর একটি ঘর বানানো হয়।

এরপর পাতলা একটি চাড় ( অর্থাৎ মাটির তৈরী প্লেট বা পাতিলার ভাঙ্গা টুকরা) প্রথম ঘরে ফেলে এক পা শূন্যে রেখে এবং দম দিতে দিতে গুটি (চাড়) কে সবগুলো ঘর অতিক্রম করে অর্ধচন্দ্রাকৃতির ঘরে এনে পা নামিয়ে দম ফেলতে হয়। তারপর এই ঘর থেকে গুটিকে পা দিয়ে আঘাত করে সব ঘর অতিক্রম করতে হয়।

এ সময় গুটিটি সব ঘর অতিক্রম না করলে অর্ধচন্দ্রাকৃতির ঘর থেকে বের হয়ে শূন্যে পা তুলে দম নিতে নিতে তাকে আবার আগের নিয়মে ঘর থেকে বের করে আনতে হয়। খেলোয়াড়রা কপালে গুটি রেখে উপর দিকে তাকিয়ে ৮টা ঘরের দাগে পা না ফেলে অর্ধচন্দ্রাকৃতির ঘরে যেয়ে আবার প্রথম ঘরে ফেরত আসতে পারলে সে ঘর কেনার যোগ্যতা অর্জন করে। কুতকুত খেলায় যে ঘর কেনা হবে সেই ঘরে খেলার অপর সাথি পা বা গুটি ফেলতে পারবেন না।

ঘর কেনার প্রক্রিয়াকালীন সময়ে খেলোয়াড়দের দাঁত দেখা গেলে ঐ খেলোয়াড় খেলা অবস্থায় মারা যায়। ক্রমান্বয়ে ঘর কিনে শেষ ঘরটি দখল করার মাধ্যমে খেলার নিস্পত্তি হয়।

এ খেলা সম্পর্কে উপজেলার ধানীখোলা গ্রামের গৃহিনী মাহমুদা আক্তার বলেন, প্রথমেই একের ঘরে চাড় ফেলতে হবে। তারপর ধাক্কাইয়া ধাক্কাইয় সেই চাড় এক এর ঘর থেক দুইয়ে, দুই থেকে তিনে, তিন থেকে চারে নিয়ে জোরে ধাক্কা দিয়ে সাতের ঘরে নিতে হয়। এ সময় ৫ ও ৬ ঘরে দুই পা দুই দিকে ফেলে লাফ দিয়ে ৭ এর ঘরে গিয়ে এক সাথে দুই পা ফেলতে হয়।

তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয়, কুতকুত খেলার ঘরটার জন্য যে দাগ কাটা রয়েছে সে দাগে যেন কখনই পা না পরে। এছাড়া খেলার চাড়টা যেন দাগে না পরে এবং দাগের বাইরে না যায়। একই সাথে দমের (নিঃশ্বাস) ব্যপারে খেয়াল রাখতে হয়, নিঃশ্বাস না ছেড়ে “ কুত কুত কুত কুত কুত কুত কুত – কুথাহ” বলে প্রতিটি ঘরে এক পা এক পা করে রেখে যেতে হবে। এভাবে একে একে ছয়টি ঘর খেলতে হয়।

এই ভাবে একে একে সব ঘর কিনে ফেলার পর সর্বশেষ ৭ নাম্বার ঘর কেনা শেষে খেলাটি শেষ হয়। তিনি তাদের ছোট বেলার সেই কুতকুত খেলার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, আমাদের সময়ের খেলাগুলো ছিল শরীরের জন্য অনেক উপকারী।

নব্বইর দশকে কুতকুত, গুল্লাছুটি ও মেন্দি খেলা ছিল ত্রিশালে মেয়েদের জনপ্রিয় খেলা। কিন্তু তা আজ আর নেই। এ সময় পাশে থাকা সপ্তম শ্রেণী পড়ুয়া রুনা বলে, কুতকুত আবার কোন খেলা? এ থেকেই পরিস্কার প্রতিয়মান হয় যে, ত্রিশাল থেকে কুতকুত খেলাটি হারিয়ে গেছে।

সচেতন মহল মনে করেন, দেশীয় সংস্কৃতি ও গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সবাইকে বিশেষ করে অবিভাবকদের নিজ নিজ সন্তান কে হারিয়ে যাওয়া খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। না হলে এক সময় কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে গ্রামবাংলার এসব খেলাধুলা।

মামুনুর রশিদ ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি। 

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন