🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ শনিবার, ৯ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ২৪ জুলাই, ২০২১ ৷

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘হটস্পট’

Shatkhira news
❏ মঙ্গলবার, জুলাই ৬, ২০২১ খুলনা

জাহিদ হোসাইন,সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালের করোনাভাইরাস ইউনিট ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ওয়ার্ডের বাইরে বিরাজ করছে থমথমে নিরবতা। প্রায়শই শোনা যাচ্ছে বুকফাঁটা কান্নার শব্দ। চোখ দিয়ে অঝরে ঝরছে পানি! এভাবেই স্বজনের লাশ নিয়ে আহাজারি করতে করতে হাসপাতাল ত্যাগ করছেন অনেকেই।

এমন দৃশ্য যখন ভয়াবহ এক পরিস্থিতির বার্তা দিচ্ছে-ঠিক তখনই স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া অনেজ রোগীই আইসোলেশনে না থেকে বুক ফুঁলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি ও চলাফেরার নিষেধাজ্ঞা ভেঙে রোগীরা আইসোলেশন সেন্টার থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে ও হাসপাতালের বাইরে ঘুরতে থাকাই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে মেডিকেল কলেজের আশপাশের এলাকা জুড়ে দেখা দিয়েছে অজানা আতঙ্ক। প্রশ্ন উঠেছে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

সোমবার(৫ জুলাই) সরেজমিনে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান কালে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে জরুরি বিভাগ, হাসপাতালে সামনের খাবারের দোকান থেকে চায়ের দোকান, ফার্মেসি থেকে আবার হাসপাতালে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে করোনা উপসর্গ ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অনেক রোগীকে। এছাড়া চিকিৎসাধীন রোগীদের চেয়ে রোগীর স্বজনরাসহ দালাল ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভীড় সবচেয়ে বেশী লক্ষ করা গেছে হাসপাতালের অভ্যন্তরে। কোন স্বাস্থবিধির তোয়াক্কা না করেই সাতক্ষীরার একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে রোগীর চেয়ে রোগীর স্বজন, দালাল ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা চলাচল করায় তাদের মাধ্যমে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রকট বলে ধারণা করছেন অনেকেই।

এছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের স্বজনদের মধ্যে কোনরূপ স্বাস্থ্য সচেতনতা লক্ষ করা যায়নি। তাদের গাদাগাদি হয়ে লাশ ধরে এম্বুলেন্স এ তুলতে দেখা গেছে।

জানা যায়, করোনা সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে ৯০জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে সামেক কর্তৃপক্ষ। তবে জেলায় দিনদিন করোনা আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়তে থাকলে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবার জন্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজকে সম্পূর্ণ রূপে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করে স্বাস্থ্যবিভাগ। করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ ব্যতিত কোন রোগীকে বর্তমানে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে না এখানে।
তবে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঘোষণার পর করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ৯০টি বেড ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বর্তমানে ২৫০টি করা হয়েছে। বর্তমানে মেডিকেল কলেজে নির্ধারিত ২৫০টি বেডের বিপরীতে সোমবার (৫ জুলাই) নাগাদ করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির সংখ্যা ২৮০ জন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একাধিক আনসার সদস্যরা জানান, বিগত কয়েকদিনধরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় কয়েকজন করোনা রোগীকে ভবন থেকে নেমে হাসপাতালের আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে।তাদের অনেকে সিগারেট, খাবারসহ ঔষধপত্র ক্রয়ের জন্য ফার্মেসীতে যাচ্ছেন। তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে আমাদের বোকা বানাচ্ছেন।

অনেক প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগ করে বলেন, এ দৃশ্য শুধুমাত্র গত কয়েকদিন ধরেই হচ্ছে। বিকাল বেলা কিংবা সন্ধ্যার দিকে আইসোলেশন ওয়ার্ড থেকে রোগীরা বেরিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই আবার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও দেখা করছেন।

সরেজমিনে হাসপাতালের ভিতরে গেলে সত্যতা মেলে প্রত্যক্ষদর্শীসহ আনসার সদস্যদের কথায়। আইসোলেশন সেন্টারের করোনা ওয়ার্ডের ভেতরে রোগীর স্বজনরা দেখা করতে এসেছেন। তাদের অনেকে আবার কোনপ্রকার স্বাস্থবিধি না মেনে করোনা উপসর্গ ও আক্রান্ত রোগীদের বিছানায় বসেই গল্পে মেতে উঠেছেন। আবার অনেক রোগী হাতে ক্যানোলা পড়া অবস্থায় চলাচল করে বেড়াতে দেখা গেছে।

এবিষয়ে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীদের দেখভালে থাকা একাধিক নার্সরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রোগীসহ রোগীর স্বজনদের এভাবে চলাচলের কারনে আমাদের অনেক সহকর্মী বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এবিষয়টা নিয়ে আমরা বড় স্যারদের নিকট একাধিকবার অভিযোগ করেছি। তবে তাদের কাছে আমাদের কোন কথার গুরুত্ব নেই। তারপরেও আমরা চেষ্টা করছি রোগীরদের সাথে রোগীর স্বজনরা যেনো কম দেখা করতে পারে। তবে একেকজন একেকজনের সুপারিশে আসেন। দেখতে আসা এসব স্বজনদের অধিকাংশই আবার স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে ফটোসেশনে ব্যস্ত থাকেন।

তারা বলেন, আমাদের কাজ রোগীর সেবা দেওয়া। আমরা সেটাই করি। বর্তমানে প্রয়োজনের চাইতে আমাদের নার্সদের সংখ্যা অনেক কম। তার উপর করোনা আক্রান্ত হয়ে ও মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন অর্ধশতাধিক নার্স। বড় স্যাররা তো শুধু রাউন্ড মেরে চলে যান। বাকিসময় আমাদেরকে থাকা লাগে হাসপাতালে।

তারা আরো বলেন, আমাদের অল্পসংখ্যক নার্স দ্বারা কীভাবে ২৮০ জন রোগীকে নজরে রাখা সম্ভব? আমরা তাদের সেবা দেয় আর তারা আমাদের পাহারা দেন। আমরা ওয়ার্ড থেকে আড়ালে গেলেই তারা বাইরে বের হয়ে যান।

তবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ কুদরত-ই-খুদা বলেন, এবিষয়টি নিয়ে ইতিপূর্বেও আমি একাধিকবার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হবে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন