• আজ মঙ্গলবার, ১২ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ২৭ জুলাই, ২০২১ ৷

হাসপাতালের জরুরী বিভাগ এখন ঘুমানো, রান্না ও মোটরসাইকেলের গ্যারেজ!

news5w4322
❏ শনিবার, জুলাই ১০, ২০২১ খুলনা, দেশের খবর

জাহিদ হোসাইন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: মোটরসাইকেল রাখা হয়েছে লক করে, মটর সাইকেলের পূর্বকোনে রান্নার জন্য রাইসকুকার, কারিকুকারসহ নিত্যপণ্য সামগ্রী সাজানো। তার বামপাশে রয়েছে পানিভর্তি নোংরা প্লেট, রান্নার জন্য তেল, লবন, আলু, ঝাল, মরিচসহ রান্নার বিভিন্ন উপকরণ। একটু নিচেই নোংরা মেঝের উপরে একটা প্যাকেটের ভিতরে রান্নার চাউল। পাশে রাখা আছে ৪টি বেড। বেডের উপরে নোংরা জামাকাপড় পরিষ্কার করে টানানো। বেডে রয়েছে ঘুমানোর জন্য একাধিক বালিশ ও কম্বল।

আপনারা হয়তো উপরের লেখা পড়ে ভাবছেন এটা হয়তো কোন আবাসিক হোটেলের রুমের চিত্র। তবে ওটি কোন আবাসিক হোটেলের রুম নয়। ওটি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিত্র। যে কেউ ওই চিত্র দেখলেই আতকে উঠবেন!

শুক্রবার (০৯ জুলাই) দুপুরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে যেয়ে ওই দৃশ্য দেখা যায়।

‘করোনার মহামারীর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় জরুরী বিভাগ। ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জরুরী বিভাগকে আবাসিক রুম, রান্নাঘর, মটর সাইকেলের গ্যারেজে পরিণত করে ফেলেছেন হাসপাতালের কিছু ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারী’ এমন অভিযোগ করেন ওখানে কর্মরত অনেকেই।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, প্রতিদিন মেডিকেলে করোনাক্রান্ত হয়ে ও করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন। তাদের লাশগুলো এই জরুরী বিভাগের ভিতর দিয়ে বাইরে বের করা হয়। জরুরী বিভাগে মটর সাইকেল রাখার কারণে লাশ বের করতে অনেক সমস্যা হয়। জরুরী বিভাগ বন্ধ হওয়ার পর থেকে কিছু ডাক্তার, নার্স, ও কর্মচারীরা জরুরী বিভাগের অধিকাংশ রুমগুলো আবাসিক রুম, রান্নাঘর ও মোটরসাইকেল গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করছেন। অনেকেই এ ব্যাপারে ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখেছি। অনেকেই তাদের দ্বারা লাঞ্ছিতও হয়েছেন।

জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হলেও চালু ছিলনা হাসপাতালের জরুরী বিভাগ। জরুরী বিভাগ চালুর দাবিতে কয়েক বছর ধরে একাধিকবার কর্মবিরতি পালন করেছেন ওই হাসপাতালটির ইন্টার্নী চিকিৎসকগণ। ইন্টার্নী চিকিৎসকদের দাবির মুখে গতবছরের ২৪ অক্টোবর জরুরী বিভাগ চালু করে স্বাস্থ্য বিভাগ।

কিন্তু সাতক্ষীরা জেলায় করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি বছরের ১৬ জুন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজকে সম্পূর্ণরূপে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করলে বন্ধ হয়ে যায় জরুরী বিভাগের সকল কার্যক্রম। ওই সুযোগে হাসপাতালটির ডাক্তার, নার্সসহ স্টাফরা হাসপাতালটির জরুরী বিভাগের অধিকাংশ রুম গুলোকে নিজেদের আবাসিক রুম, রান্না ঘর ও তাদের ব্যবহৃত যানবাহন রাখার জন্য গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

সাহাজদ্দীন, আব্বুর গফফার, সালেহা খাতুনসহ একাধিক রোগীর স্বজনরা বলেন, মেডিকেলে নির্ধারিত বেডের চেয়ে বর্তমানে রোগীর সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক বেশি। বেড স্বল্পতার কারনে আমাদের অনেকেই মেঝের উপরে শুয়ে নোংরা পরিবেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন। জরুরী বিভাগে রাখা বেডগুলো রোগীদের চিকিৎসার জন্য চাইলে সেটি দেওয়া হয়নি। কিছু বললেই স্টাফরা বিভিন্নভাবে হুমকি দেন। এজন্য আমরা কিছুই বলিনা।

তারা আরো বলেন, কিছুদিন আগে অক্সিজেনের অভাবে অনেক রোগী মারা গেছেন। আমরা যদি কিছু বলি তবে আমাদের রোগী যে চিকিৎসার অভাবে মারা যাবেনা তার গ্যারান্টি কী? তাদের অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বিনা চিকিৎসায় রোগীরা মারা যাবেন। রোগী মারা যাওয়ার কারন হিসেবে তারা একাধিক অজুহাত দিবেন। তাদের প্রয়োজনে কর্মবিরতি করবেন। এতে আমাদের মতো সাধারণ জনগণের ক্ষতিটাই সবচেয়ে বেশি হবে।প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের না থাকায় না চাইলেও বাধ্যহয়ে এই সরকারি হাসপাতালগুলোতে আমাদের চিকিৎসা সেবা নেওয়া লাগে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালে দায়িত্বরত একাধিক আনসার সদস্য বলেন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচ তলায় সিড়িঁর দক্ষিণ পাশে রয়েছে ডাক্তার, নার্স ও স্টাফদের মোটরসাইকেল ও সাইকেল রাখার ব্যবস্থা। মেডিকেলকে সম্পূর্ণ রূপে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার আগে ওই স্থানে সকলে গাড়ি পার্কিং করে রাখতেন। তবে মেডিকেল কলেজকে সম্পূর্ণ রূপে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার পরপরই কিছু ডাক্তার, নার্স ও স্টাফ জরুরী বিভাগের অধিকাংশ রুমকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন।

তারা আরে বলেন, আমরা হুকুমের গোলাম। কারো বিরুদ্ধে কিছু বলার ক্ষমতা আমাদের নেই। বললেই দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দিয়ে দিবে। এ কারণে ভয়ে কোনকিছু বলতে পারিনা।

তবে জরুরী বিভাগকে নিজেদের প্রয়োজনে আবাসিক রুম, রান্নাঘর ও গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই জানিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ কুদরত-ই-খুদা বলেন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজকে সম্পূর্ণ রূপে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করায় বন্ধ রয়েছে জরুরী বিভাগের সকল কার্যক্রম। তবে জরুরী বিভাগের রুম ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যাবেনা। কেউ এটা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন