• আজ মঙ্গলবার, ১৯ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ৩ আগস্ট, ২০২১ ৷

মানিকগঞ্জে তাঁত শিল্প বিলীন হওয়ার পথে

Manikganj Pic
❏ শনিবার, জুলাই ১০, ২০২১ ঢাকা

দেওয়ান আবুল বাশার, স্টাফ রিপোর্টার: বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে। দীর্ঘ সময়ব্যপী করোনার এই ধাক্কায় মূলধন খুইয়েছে অনেকেই, আবার জীবিকার তাগিদে অনেকেই পেশা বদল করেছেন। আর তাঁতের সঙ্গে যারা যুক্ত রয়েছেন তাদের নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে। এমনটাই চিত্র জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের তাঁত পল্লী এলাকার।

তাঁত শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে গেলে এখনি সরকারের নিকট হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন জেলা তাঁতি কল্যাণ সমিতি।

বরাইদ ইউনিয়নের সাভার, আগসাভার, হামজা গ্রাম তাঁত শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এখানে তাঁতের শাড়ি, ওড়না, লুঙ্গী প্রভৃতি তৈরি করা হয়।  একসময় এ এলাকার শত-শত পরিবার এ শিল্পের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো, এতে করে এ পেশায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিলো হাজারো পরিবারের ।

করোনা মহামারির শুরু থেকে গত এক বছরে তাঁতের ছোট-বড় সকল প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়ে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যবস্থাপনায় জটিলতা এবং পণ্যের নিম্নমূখী বাজার সবমিলিয়েই ক্ষতির মুখে প্রতিষ্ঠানগুলো। উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাঁত শ্রমিকদের কাজ করার সুযোগ সীমিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁত শ্রমিকদের আশানুরূপ বেতন দিতে পারছে না। এর ফলে পৈত্রিক এই পেশায় টিকে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে শ্রমিকদের। বর্তমানে তাদের সাংসারিক অবস্থা বিপর্যস্ত। নতুন করে ব্যবসা করার মতো কোন পুঁজি নেই  তাঁতিদের। উপায় না পেয়ে পেশা বদল করছে তাঁত শ্রমিকেরা। এই তাঁত শ্রমিকদের অন্যকোন পেশার প্রতি অভিজ্ঞতা না থাকায় ভালো কোন কাজের  সুযোগ পাচ্ছে না। বাধ্য হয়েই শারিরিক পরিশ্রমের কাজগুলোকে বেছে নিতে হচ্ছে তাদের। এতে করে নিদারুন কষ্ট আর হতাশায় দিন যাপন করছেন তারা।

এলাকাবাসীর কাছ থেকে জানা যায়, অনেকগুলো কারখানা ছিল এখানে তবে বেশির ভাগই বন্ধের পর্যায়ে এবং কিছু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার একজন উদ্যোক্তা সালাম মিয়া জানান, তাদের পূর্বপুরুষরাও এই ব্যবসা করতেন তবে কেউ কোনদিন এরকম বিপদের সম্মুখীন হয়নি। তিনি আরও বলেন, এই খারাপ অবস্থায় কেউ তাদের কোনো সহায়তা করেনি। তাদের এখান থেকে তৈরি পোশাকগুলোপ দেশের বিভিন্ন জেলাতে পাঠানো হতো। তাঁতিরা নতুন করে যে শুরু করবে সেই উপায় তারা খুঁজে পাচ্ছে না। দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এ ব্যাপারে তারা সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন।

আগসাভার এলাকার তাঁতি আরমান মিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, করোনা আইসা আমাগো কাম সাড়া, রোজগার বন্ধ। দিন কাটে খুব কষ্টে। একবার শুনলাম সরকার আমাগো সাহায্য করব, প্রণোদনা দিব। কো কিছুই তো পাইলাম না। এদিকে ঘাড়ের ওপর ঋণের বোঝা, কিস্তিআলা চাপ দেয়। কামাই না হইলে কেমনে টাকা পরিশোধ করুম। পাশাপাশি আরো একজন তাঁতি মোহর আলীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, জন্মের পর থিকাই এই পেশায় আছি। আমরা অন্য কোন কাজ শিখি নাই যে করুম। করোনা আসার পর থিকাই ব্যবসায় লস খাইছি। এক বছর পার হইয়া গেল ব্যবসা চালানোর মত সামনে আর কোন পথও দেখতেছি না। অনেক তাঁতিই এখন অন্য পেশায় কাজ করছে। একটা সংসার চলে আমার ওপর, এখন কি করুম কিছুই বুঝতাছি না।

মানিকগঞ্জ তাঁতি কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা কোষাধক্ষ শরিফ উল্লাহ বলেন, তাঁত পেশার সাথে সম্পৃক্ত তাঁতিরা জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে খুব কষ্ট নিয়ে আদি পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। করোনা কালীন এই মহামারি বিবেচনা করে জেলার তাঁতিদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগীতা কিংবা স্বল্ব সুদে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারলে তাদের এই পেশায় টিকিয়ে রাখা যেত। এখনই তাঁতিদের উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে এই শিল্পকে জেলায় টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, সরকারিভাবে তাঁতিদের জন্য কোন প্রকার প্রণোদনা বা সহযোগিতা এখন পর্যন্ত আসেনি যদি ভবিষ্যতে আসে তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী এ ব্যাপারে সহযোগিতা করা হবে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন