• আজ মঙ্গলবার, ১২ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ২৭ জুলাই, ২০২১ ৷

লকডাউন: আয় কমে যাওয়ায় অসুস্থ-স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাঁটছে আয়শার

Fulbari Photo
❏ রবিবার, জুলাই ১১, ২০২১ রংপুর

অনিল চন্দ্র রায়,ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: ঘরে নেই চাল-ডাল। অসুস্থ স্বামীর প্রতিদিন ওষুধ লাগে দেড়শত টাকার। লকডাউনে গত এগার দিন ধরে আয় বন্ধ। হাতে নেই জমানো টাকা। তাই এখন অসুস্থ্য স্বামী আর সংসার নিয়ে চোখে আঁধার দেখছেন পিঠা বিক্রেতা আয়শা বেগম। তার উপর এনজিও থেকে নেয়া ৫০ হাজার টাকা ঋণ তো ঘাড়েই রয়েছেই। লকডাউনে কিস্তি বন্ধ থাকলেও পরিশোধের দুশ্চিন্তায় ঘুম নেই তার ক্লান্ত চোখে।

সারাদেশের মত কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে চলছে কঠোর লকডাউন। সদর ইউনিয়নের কদমতলা মোড়ে ফুলবাড়ী-বালারহাট সড়কের পাশে পিঠা-পুলির দোকান আয়শা বেগমের। এতোদিন মুখে মাস্ক পরে দূূরত্ব বজায় রেখে লোকজনকে বসিয়ে দোকান চালিয়ে আসছিলেন আয়শা। তার হাতে তৈরী তেল পিঠা-পুলি পিঠা, পিয়াজু, সিঙ্গাড়া ও চায়ের অনেক নামডাক উপজেলাসহ জেলাতেও। দোকানে তার প্রতিদিন আয় হতো ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা। এতে চলতো এনজিওর কিস্তি। সংসারের খরচ। অসুস্থ্য স্বামীর চিকিৎসা ও ওষুধ কেনা।

স্বামী-দুই নাতি-নাতনিসহ চার সদস্যদের সংসারে এখন শুধুই অভাব। লকডাউনে খুলতে পারছেনা দোকান। কোনভাবে খুললেও নেই ক্রেতা। এখন অনেকটা মানবেতর জীবন কাঁটাতে হচ্ছে আয়শা বেগমকে।

শুধু আয়শা বেগম নয়। আয়শার মতো অনেক শতশত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ শ্রমজীবি ও নিম্ন আয়ের মানুষজনও এই কঠোর লকডাউনে আয় কমে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

আয়শার বাড়ী ফুলবাড়ী উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম পানিমাছ কুটি গ্রামের জয়নাল হক (৬০) এর স্ত্রী আয়শা বেগম (৫২)। আয়শায় স্বামীর কোন আবাদি জমি-জমা নেই। মাত্র দেড় শতক জমির উপর দুইটি টিনের চালায় তাদের সববাস। এক ছেলে,এক মেয়ে। অভাবের তারনায় ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা করতে পারেনি। অনেক কষ্টে মেয়েটার বিয়ে দিছেন। এক মাত্র ছেলের বিয়ে দিয়েও দেন। ছেলে বিয়ের কয়েক বছর আলাদা হয়ে যায়। ছেলে আলাদা হলেও নাতি-নাতনিদেরও দেখাশুনা করেন আয়শা বেগম।

সংসারের বেহাল দশা দেখে আয়শা বেগমের মাথায় একটা বুদ্ধি চলে আসে। তিনি গরীর দিন মজুর স্বামী মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও জীবন-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাড়ীর পাশে সড়কের পাশে কোনরকমে একখানা ছোট টিনের চালা ঘর তোলেন। শুরু হয় আয়শার হাতের তৈরী  পিঠা-পুলি,পিয়াজু,সিঙ্গাড়া ও চা বিক্রি। আস্তে আস্তে আয়শার দোকানের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী তেলের ভাঁজা  পিঠা-পুলির বিক্রির প্রচার ও জনপ্রিয় হয়ে উঠলে দুর-দুরান্ত থেকে ক্রেতা আয়শা বেগমের হাতে তৈরী পিঠা-পুলি খাইতে দোকানে ভিড় জমায়। এক সময় আয়শা বেগম ও জয়নাল হকের অনেক কষ্ট দিন কাঁটলেও  আল্লাহের রহমতে পিঠা-পুলি ও চা বিক্রি করে কিছু করতে না পারলেও কিস্তি ও অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসাসহ কিছুটা সচ্ছল ভাবে জীবন-যাপন কাঁটতো। কিন্তু চলমান কঠোর লকডাউনে বিক্রি কমে যাওয়ায় অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন আয়শা।

পিঠা-পুলি বিক্রেতা আয়শা বেগম জানান, বাঁহে ঘরে মোর অসুস্থ স্বামী। হারনিয়া অপারেশন করায় পাঁচ বছর থেকে কাজ-কাম করতে পারে না। পিঠা-পুলি বিক্রি করেই চলতো আমাদের সংসার। ১৪ বছর ধরে পিঠা-পুলি বিক্রি করছি। লকডাউনের পূর্বে দোকানের বিক্রি ভালই হতো। গড়ে প্রতিদিন ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা বিক্রি হতো। খরচ মিঠিয়ে গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ শত টাকা আয় হতো। সপ্তাহে কিস্তি ,অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসাসহ দুবেলা দুমুঠো খাবার জুটতো। এখন কঠোর লকডাউনে ভয়ে ভয়ে গত ১১ দিন থেকে দোকান করলেও ক্রেতা না থাকায় এখনো ১০০ টাকার মূখ দেখিনি। লকডাউনে কিস্তি বন্ধ থাকলেও অসুস্থ স্বামী-নাতি-নাততিকে নিয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছি

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমন দাস জানান, ১ জুলাই থেকে চলমান কট্টর লকডাউন কার্যকর করেছে উপজেলা প্রশাসন। কঠোর লকডাউন কার্যকর করতে সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ সবাই সমন্বিতভাবে মানুষকে সচেতন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থাকার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

তিনি আরও জানান,উপজেলা প্রশাসন গত ৮ দিনে বিভিন্ন হাট-বাজারে কট্টর বিধিনিষেধ অমান্য করায় পথচারী ও ব্যবসায়ীর জরিমানা করা হয়েছে। ইতি মধ্যে ক্ষদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমজীবীসহ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারী বরাদ্দ এসেছে। আজ রবিবার থেকে খাদ্য সামগ্রী বিতারণ শুরু করা হয়েছে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন