• আজ শুক্রবার, ১৫ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ৩০ জুলাই, ২০২১ ৷

বসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েই শেষ হয়েছে হবিগঞ্জের স্বপ্নার স্বপ্ন

Habigonj news
❏ রবিবার, জুলাই ১১, ২০২১ সিলেট

মঈনুল হাসান রতন, হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ বসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েই শেষ হয়েছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের স্বপ্নার স্বপ্ন। বলছি  নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কোম্পানিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত স্বপ্না রাণীর কথা।

পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা দূর করতে প্রায় ৬ মাস পূর্বে স্বামীসহ সপরিবারে নারায়ণগঞ্জে সেই কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলেন নিহত স্বপ্না রাণী ও মেয়েসহ পরিবারের সদস্যরা। বাড়িতে এখন মেয়েসহ তার স্বামী পৌঁছালেও নেই শুধু স্বপ্না রানী। যে কারণে এখন শোকের মাতম চলছে তাদের বাড়িতে। নিহত স্বপ্না রাণী নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নের গোলডুবা আদর্শ ভূমিহীন গ্রামের যতী নমের স্ত্রী।

জানা যায়, স্বপ্না রাণী তার স্বামী যতী নমসহ ৫ মেয়েকে নিয়ে প্রায় ৬ মাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জের ভাড়া বাসায় উঠেন। পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা দূর করতে তারা শ্রমিকের কাজ নেন রূপগঞ্জের সেই কারখানায়। কারখানাটিতে স্বপ্না রানী, তার মেয়ে বিসকা রাণী ও স্বামী যতী নম কাজ করতেন। অন্য মেয়েরা অপর একটি চায়না ব্যাগ কোম্পানিতে কাজ করতেন। স্বপ্না রানী ও তার মেয়ে বিসকা রাণী ওই কোম্পানির নিচতলায় কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট পূর্বে স্বপ্না রানীকে ৩য় তলায় ঢেকে নেন তার বস। সেখানে থাকা অবস্থায়ই ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।

আর তাতেই শেষ হয়ে যায় স্বপ্না রানীর স্বপ্ন। আগুন মুহূর্তের মধ্যে কারখানার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নিচতলা থেকে মেয়ে বিসকা রাণী বেরিয়ে আসলেও ৩য় তলা থেকে আসা হয়নি মা স্বপ্নার। পরে ৯ জুলাই (শুক্রবার) স্বপ্না রানীর মরদেহ শেষবারের মতো নিয়ে আসা হয় গ্রামের বাড়ি নবীগঞ্জে। এ সময় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় জমায় পাড়া প্রতিবেশীরা। পরে সেখানেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

বেঁচে যাওয়া স্বপ্না রানীর মেয়ে বিসকা রানী জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় তার মা জীবন বাঁচাতে এই কোম্পানির ৩য় তলার জানালার কাছ থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে লুটে পড়েন। ওই সময় তার পুরো শরীর রক্তমাখা ছিল। সেখানকার লোকজন তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বিসকা রাণী বলেন, চোখের সামনে মায়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কিছুতেই মানতে পারছি না। মৃত স্বপ্না রাণীর স্বামী যতী নম জানান, তাদের পরিবারে অভাব অনটনের কারণে এবং ঋণের বোঝা দূর করতে তারা সপরিবারের নারায়ণগঞ্জে গিয়ে কারখানায় শ্রমিকের কাজ নেন। ঘটনার দিন তিনি নিজেও ওই কারখানায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি ওভার টাইম না করে বাসায় ফিরে আসেন। পরবর্তীতে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে স্ত্রীর মরদেহ দেখতে পান। আমরা অসহায় মানুষ। সরকার যদি আমাদের সাহায্য করত তা হলে ভালো হতো বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, সেজান জুস কারখানায় প্রায় সাত হাজার শ্রমিক কাজ করেন। সাততলা ভবনে থাকা কারখানাটির নিচতলার একটি ফ্লোরের কার্টন থেকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। একপর্যায়ে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কালো ধোঁয়ায় কারখানাটি অন্ধকার হয়ে যায়। পরে শ্রমিকরা ছোটাছুটি করতে শুরু করে। কেউ কেউ ভবনের ছাদে অবস্থান নেন।

আবার কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে শুরু করেন। শনিবারও অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন কারখানাটির সামনে। ফায়ার সার্ভিসের কাছে ৫২ জনের নিখোঁজের তথ্য লিপিবদ্ধ করেছেন স্বজনরা। যাদের নাম নিখোঁজ তালিকায় আছে তাদের বেশির ভাগই কাজ করতেন চারতলায়। চেনার মতো অবস্থা নেই উদ্ধার হওয়া ৪৯টি মরদেহের। যাদের নাম এ তালিকায় এসেছে তাদের বেশির ভাগ মানুষই হয়তো ফিরে আসবেন না আর।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন