শরীয়তপু‌রে ‘আগ্রহ হারা‌চ্ছে’ আশ্রয়ণ প্রক‌ল্পে, ৬ মাসে দুইবার সংস্কারের পরও আতঙ্ক

house 7
❏ সোমবার, জুলাই ১২, ২০২১ ঢাকা, দেশের খবর

নয়ন দাস, স্টাফ রি‌পোর্টার, শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘ‌রে থাকতে আগ্রহ হারিয়েছে উপকারভোগীরা। নানা সমস্যার কারণে হস্তান্তরের চার-পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও অনেকে উপকারভোগী ঘরে উঠেনি। আবার কেউ কেউ ঘরে উঠেও ফিরে গেছেন পুরনো ঠিকানায়।

এছাড়া গৃহ নির্মাণে নানা ত্রুটির কারণে এপর্যন্ত দুইবার মেরামত করা হয়েছে ওই ঘরগুলো। বে‌শিরভাগ ঘরের সামনের পিলারে ফাটল ধরেছে, ফ্লোরও ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। অত্যন্ত নিম্ন মানের মালামাল ব্যবহার করার অ‌ভি‌যোগ র‌য়েছে প্রকল্প‌কে ঘি‌রে। এখনো চলছে জোড়াতালির কাজ।

ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২০-২১ অর্থ বছরে মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন গৃহহীন পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২ শতক জমি ও একটি সেমিপাকা ঘর উপহার হিসেবে দেয়ার জন্য আশ্রয়ণ-২ নামে একটি প্রকল্প চালু করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় ডামুড্যা উপজেলায় প্রথম পর্যায়ে ৬৬ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৮ টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ২ শতক জমির উপর একটি সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করে হস্তান্তর করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়াল মাধ্য‌মে গৃহ হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও অনেক উপকারভোগী এখনো ঘরে উঠেনি। অনেকে আবার ওঠেও নানা সমস্যার কারণে পূর্বের ঠিকানায় ফেরত গেছেন।

সরেজমিন ঘরে দেখা যায়, পূর্ব ডামুড্যা ইউনিয়নের দাইমি চরভয়রা বিলের ভিতর কৃষি জমিতে ২২টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ওই ঘরগুলো হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু আশ্রয়ণ প্রকল্পে যাওয়ার কোন রাস্তা না থাকায় উপকারভোগীরা ঘ‌রে থাকার আগ্রহ হারিয়েছে। আশ্রয়ণটি নির্মাণের সাথে জড়িতরা বর্ষার স্বাভাবিক পানির উচ্চতার স্তর বিবেচনায় না নিয়ে ওই খানে ঘরগুলো নির্মাণ করেছে।

স্থানীয়দেরও আশংকা বর্ষায় আশ্রয়নটি পানিতে তলিয়ে যাবে। মানুষ বসবাসের উপযোগী থাকবে না। তাছাড়া আশ্রয়নটি ডামুড্যা উপজেলা শহর থেকে অনেকটা দুরে বিচ্ছিন্ন জায়গায় নির্মাণ করায় শ্রমজীবি এসব মানুষের আয় রোজগারে নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। তাই অনেক পরিবার আশ্রয়ণে উঠেনি। ২২টি ঘরের মধ্যে মাত্র ৫টি ঘরে উপকারভোগীরা বসবাস করছে। বাকীদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবার পরিজন নিয়ে ঘরে উঠেও নানা সমস্যার কারণে থাকতে পারেনি। আবার অনেকে এখনো উঠেইনি।

চরভয়রা পূর্ব ডামুড্যা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে ১৪টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এই ঘরগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ে উদ্বোধন শেষে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘরগুলো রাস্তার পাশে হলেও রাস্তা থেকে ৩ ফুট গভীরে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া এমনভাবে ঘরগুলো করা হয়েছে যে- কিছু ঘরে বসবাস করাই প্রায় অসম্ভব।

একই ইউনিয়নের নওগা ১৩টি ও দারুল আমান ইউনিয়নের কাইলারা গ্রামে ১৪টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোও দ্বিতীয় পর্যায়ে উদ্বোধন শেষে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এখানো উপকারভোগীরা ঘরগুলোতে উঠতে পারেনি।

এ ঘর নির্মাণে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন তৎকালীন ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মর্তুজা আল মুঈদ আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তাহমিনা আক্তার চৌধুরী। যদিও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার চৌধুরীর বিরু‌দ্ধে বি‌ভিন্ন অ‌নিয়‌মের অ‌ভি‌যোগ র‌য়ে‌ছে।

দাইমী চরভয়রা আশ্রয়নের উপকার ভোগী কল্পনা বেগম বলেন, আমি ঘরে উঠেছিলাম। আমার ঘরের সামনে তিনটি পিলারের দুটি পিলারই ফেটে গেছে। বারান্দার মেঝে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। আমি স্যারদের জানিয়ে, ভয়ে চলে গেছি। এখান থেকে বের হওযার কোন রাস্তা নাই। একহাটু কাদা পানি ডিঙ্গিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি দিয়ে যেতে হয় রাস্তায়। এখনো বিদ্যূৎ সংযোগ পাই নাই। তাই থাকার পরিবেশ হলে আমার ঘর মেরামত করার পরে এখানেই থাকবো।

উপকার ভোগী ভিক্ষুক মাজেদা বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রীর ঘর পেয়ে খুশি হয়েছি। সেই ঘরেই থাকি কিন্তু এখান থেকে বের হতে পারি না। ভিক্ষা ছাড়া আমার সংসার চালানোর কোন উপায় নেই। এখন আমি বিপদে পড়েছি।

উপকার ভোগী জহুরা বেগম বলেন, উদ্বোধনের পরেই আমরা ঘরে উঠেছি। কিন্তু এখনো বিদ্যূৎ সংযোগ পাইনি। প্রচুর মশা। মানুষ থাকার পরিবেশ নেই। এলাকায় কোন কাজ নেই। তাই এখানে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। অনেকেই ঘরে উঠছিল। সমস্যার কারণে চলে গেছে। আমাদের যাওয়ারও জায়গা নেই। ঘরটা ফেটে যাওয়ার পরে সংস্কার করে দিয়েছে স্যারেরা।

স্থানীয় বাসিন্দা উম্মে কুলসুম বলেন, আমার বাড়িতে গত বছরই পানি উঠেছে। এটাতো অনেক নীচুতে রয়েছে। বর্ষা শুরু হলেই পানিতে তলিয়ে যাবে।

কুড়িগ্রাম জেলার রাজমিস্ত্রী জুয়েল রানা বলেন, ঘরের ফাটলগুলো জোড়া দিতে এসেছি। কাজ শেষ করতে আজকের পুরো দিন লেগে যাবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তহমিনা আক্তার চৌধুরীকে বারবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

ঘর নির্মাণ কমিটির সভাপতি তৎকালীন ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুর্তজা আল মুঈদ বলেন, আমরা দরদ দিয়েই ঘরের নির্মাণ কাজ শেষ করেছি। ফেটে গেলে তো কিছু করার নেই। পাঁচতলা বিল্ডিং ও ফেটে যায়। সরকার যদি বরাদ্দ দেয় তাহলে মেরামত করে দিব।

সদ্য যোগদানকৃত ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান সবুজ বলেন, জেলা প্রশাসক স্যারের নির্দেশে আমি আশ্রয়ণের ঘরগুলো পরিদর্শন করে প্রকৃত অবস্থা তাকে জানিয়েছি। ছোট খাট কিছু সমস্যা আছে সেগুলো রিপেয়ার করার কাজ শুরু করেছি।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন