• আজ শুক্রবার, ১৫ শ্রাবণ, ১৪২৮ ৷ ৩০ জুলাই, ২০২১ ৷

প্রতারক চক্রের থাবায় ফুলবাড়ীর ৪ দিনমজুর কারাগারে, পরিবারগুলোতে কান্না থামছেই না

news524322
❏ বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৫, ২০২১ রংপুর

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা- পাঁচটি অসহায় দিনমজুর পরিবারের ১৭ জন সদস্যের চোখে-মূখে এখন শুধুই অশ্রু। কাঁদছেন তাদের আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশিরাও। গত ১৪ দিন ধরে খাওয়া-নাওয়াও ভুলে গেছেন তারা।

একদিন কাজ না করলে যাদের পেটে খাওয়ার জোটে না। এক কথায় কাজ-কাম করলে খাবার জোটে, কাজ না করলে উপবাস। এভাবেই অসহায় পরিবারগুলো খেয়ে না খেয়ে তাদের পরিবার-পরিবজন নিয়ে দিন পার করতেন। যেন অভাবেই তাদের নিত্যসঙ্গী।

অভাবেই ঠেলে দিয়েছে চরম এক বিপদে। ৫ জন দিনমজুরের মধ্যে বিধবা ফুলমনি রানী (৩৭), কমল চন্দ্র রায় (৩৩), প্রভাস চন্দ্র রায় (৪৫) ও রনজিত কুমার রায় (৩৭) এখন কারাগারে। তারা রয়েছেন গাজীপুর জেলা কারাগারে। বাড়ি ছাড়া হয়েছেন সুবল চন্দ্র মোহন্ত (৩২) নামের দিনমজুর। এসব খেটে খাওয়া দিনমজুরের ভাগ্যে এমন বিপদ নেমে এসেছে সরকারি টাকা আত্মসাৎকারী একটি প্রতারক চক্রের প্রতারণার কারণে।

তাদের বাড়ী উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেষা ও ধরলা নদীর নিকটবর্তী বড়ভিটা ইউনিয়নের নওদাবাঁশ শল্লীধরা গ্রামে। এই গ্রামের বাসিন্দা এই ৫ অসহায়-দিনমজুর। সামান্য বসতভিটার জমি ছাড়া তাদের নেই কোন নিজস্ব স্বয়সম্বল নেই। বসবাসের ঘরগুলোও জরাজীর্ণ। দিনমজুরী করে প্রতিদিনের আয়ের উপর নির্ভরশীল তারা।

গত ২ জুলাই শুক্রবার সকালে ফুলবাড়ী থানা পুলিশের সহযোগিতায় গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার পুলিশের একটি টিম অসহায় চার দিনমজুরকে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা আত্মসাতের চেষ্টা মামলায়।

জানা যায়, ১ জুলাই গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানায় একটি মামলা করেন শ্রীপুর সোনালী ব্যাংকের হেডকোয়ার্টার শাখার ব্যবস্থাপক রেজাউল হক। মামলায় ৫ দিনমজুরসহ আসামি করা হয়েছে প্রতারক চক্রের সদস্য শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বজলুর রশিদ, হিসারক্ষণ অফিসের অডিটর আরিফুর রহমান, মাস্টাররোল কর্মচারী তানভীর ইসলাম স্বপন ও ঢাকার উত্তরখান জামতলা এলাকার শাহেনা আক্তার।

শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাস্টারোল কর্মচারী কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা তানভীর ইসলাম স্বপন (৩২) করোনায় সরকারি প্রনোদনা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখান এসব দিনমজুরকে। ১৬ জুন ৫ দিনমজুরকে নিয়ে যান সোনালী ব্যাংকের নাগেশ্বরী শাখায়। সেখানে তাদের নামে ব্যাংক হিসাব চালু করেন। এসব দিনমজুরদের শ্রীপুরে নিয়ে গিয়ে ব্যাংকের চেক বই ও বিভিন্ন কাগজপত্রে সহি ও টিপসহি নেন। তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেন ব্যাংকের সব কাগজপত্র ও চেক বই। ব্যাংক একাউন্টে প্রনোদনার টাকা পাঠানো হবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। প্রনোদনার টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় দিনমজুরেরা প্রতারক চক্রের সদস্য স্বপনের সব কথা বিশ্বাস করেছেন।

বাড়ি ছাড়া দিনমজুর সুবল চন্দ্র মোহন্তের সাথে মোবাইলে কথা হলে তিনি বলেন, তারা গাজীপুর ও শ্রীপুর কোনদিন যাননি। তানভির ইসলাম স্বপনই তাদের নিয়ে গেছেন। তাদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে প্রনোদনা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। তারা প্রনোদনার টাকার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এরমধ্যেই পুলিশ এসে চারজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ সময় তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন।

তিনি বলেন,‘আমাদের খুব অভাব তাই স্বপনের কথা বিশ্বাস করেছিলাম। তার সাথে আমাদের কোন পরিচয় ছিলো না। গ্রেফতারের ভয়ে আমি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

সোনালী ব্যাংক নাগেশ্বরী শাখার ব্যবস্থাপক শরিফুল আজম জানান, ব্যাংক হিসাব চালুর কিছুদিন পর এসব ৫ দিনমজুরের হিসাব নাম্বারে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ টাকা চলে আসে। এসব টাকা আসে সোনালী ব্যাংক হেডকোয়ার্টার শাখা থেকে। এরমধ্যে রণজিতের সঞ্চয়ী হিসাবে ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭২০ টাকা, প্রভাসের হিসাব নম্বরে ৬৫ লাখ ৭২ হাজার ১২০ টাকা, সুবলের হিসাব নম্বরে ৪০ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ টাকা, কমলের হিসাব নম্বরে ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮০ টাকা এবং ফুলমণি রানীর হিসাব নম্বরে ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৫২০ টাকা।

কয়েকদিন পর অপরিচিত ৩-৪ জন লোক এসব হিসাব নাম্বার থেকে টাকা তুলতে আসলে তার সন্দেহ হয় এবং শ্রীপুর হেডকোয়ার্টার শাখায় যোগাযোগ করে টাকা উত্তোলন বন্ধ করা হয় কিন্তু অপরিচিত লোকগুলোকে আটক করার আগেই তারা ব্যাংক থেকে সটকে পড়েন।

শ্রীপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের ভুয়া অ্যাডভাইসের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের এই টাকা এসব হিসাব নম্বরে জমা করা হয়। হিসাব নম্বরধারী দিনমজুরেরা এসবের কোনকিছুই জানতেন না বলে তিনি জানান।

প্রভাস ও কমলের মা মালতি বেওয়া (৭৫) কেঁদে কেঁদে পাগল প্রায়। তিনি দুই ছেলে ও ছেলের বৌ ভারতী রানীসহ সকলের মুক্তির দাবী জানান।

প্রভাসের স্ত্রী অঞ্জলী রানী (৪২) অশ্রু ভেঁজা কন্ঠে বলেন, তার স্বামীসহ নির্দোষ দিনমজুরদের মুক্তি চান। যারা তাদের ফাঁসিয়েছেন তিনি তাদের দৃষ্টান্তমুলক শান্তির দাবি করেন।

রনজিতের স্ত্রী ভারতী রানী (৩০) কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, তার দিনমজুর স্বামী জেলে। তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের খাবার কেনার টাকাও নেই। কিভাবে তিনি স্বামীকে বিপদমুক্ত করবেন।

তিনি বলেন, আমার স্বামীসহ ৫ জনেই নির্দোষ। শুধু অভাবের কারণে প্রনোদনার লোভে ব্যাংক হিসাব নম্বর চালু করেন। তারা এসবের কোনকিছুই জানতেন না বলেও জানান তিনি।

বিধবা ফুলমনী রানীর ছেলে সোহেল চন্দ্র রায় (২১) বলেন, মা জেলে। তিনি প্রতিবন্ধী ছোট বোন নিয়ে এখন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার মা দিনমজুরী করে আয় করতেন এবং সংসার চালাতেন। আমার কাছে টাকা নেই তাই মাকে দেখার জন্য কারাগারেও যেতে পারিনি। তার মাসহ সকলকে মুক্তির জন্য সরকারের কাছে বাদী জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ময়েজ উদ্দিন (৭৫) রহিমা বেগম (৫৫) জানান, পুলিশ যাদেরকে ধরে নিয়ে গেছে তারা সবাই গরীব-অসহায় পরিবার। একদিন কাজ না করলে পেটে ভাত যায় না। স্বপন নামের এক ব্যক্তি ১ লাখ টাকা করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার কথা বলে তাদেরকে নাগেশ্বরী সোনালী ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দেয়। পরে তাদের সবাইকে ঢাকায় নিয়ে যান। পরে তাদের সই-স্বাক্ষরসহ কাগজপত্র নিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। হঠাৎ একদিন পুলিশ এসে তাদেরকে ধরে নিয়ে যায়। তবে আমাদের জানামতে এই অসহায় মানুষগুলো অপরাধী না। এদের অনুদানের লোভ দেখিয়ে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে খাওয়া দাওয়ায় ঠিকমত করছে না। সব সময় কান্নাকাটি করছে।

নওদাবস শল্লীধরা ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মহেন্দ্রনাথ মন্ডল বলেন, এসব ৫ অসহায় দিনমজুর একেবারেই অসচ্ছল। কোন রকমেই দিনমজুরের কাজ-কাম করেই চলতো তাদের সংসার। সামান্য বাড়ি-ভিটা ছাড়া তাদের নিজস্ব কোন স্বয় সম্বল নেই। করোনায় প্রনোদনা দেওয়ার কথা বলে তাদের ফাঁসানো হয়েছে। আমরা তাদের মুক্তি দাবি জানাই। সেই সাথে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান এ ইউপি সদস্য।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তদন্ত সারওয়ার পারভেজ জানান, শ্রীপুর থানা আমাদের কাছে সহযোগীতা চেয়েছে এবং আসামি আমাদের ফুলবাড়ী উপজেলায় হওয়ায় চার আসামিকে গ্রেফতারের সহযোগিতা করা হয়েছে। গ্রেফতার চার আসামিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১ জুলাই শ্রীপ্রর থানায় মামলা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা এখন গাজীপুর কারাগারে আছেন।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন