• আজ শুক্রবার, ২ আশ্বিন, ১৪২৮ ৷ ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ৷

৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে কক্সবাজারের জেলেদের সাগরে মাছ ধরা শুরু

Cox's Bazar news
❏ শনিবার, জুলাই ২৪, ২০২১ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে শুক্রবার মধ্যরাতে। তাই দীর্ঘদিন পর কক্সবাজারের লাখো জেলে নতুন স্বপ্ন নিয়ে সাগরে যেতে শুরু করেছেন। এর আগেই জেলেরা সমুদ্রে মাছ শিকারে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। ফলে এতদিন প্রাণহীন থাকা জেলে পল্লিগুলোতে আবার ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য।

মৎস্য সংশ্লিষ্টরা জানান, সাগরে মাছ শিকার বন্ধ থাকায় কক্সবাজারের অনেক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং বরফকল ২ মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া কয়েক হাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। জেলেরা জানান, তালিকার বাইরে থাকা কয়েক হাজার জেলে সরকারি কোনো সহযোগিতা পায়নি।

কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাস্টার মোস্তাক আহমদ জানান, কক্সবাজারে ছোটবড় প্রায় ৭ হাজার মাছ ধরা ট্রলার রয়েছে। আর এ পেশায় নিয়েজিত আছেন প্রায় লক্ষাধিক জেলে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় শনিবার অনেকেই সাগরে রওনা দেয়নি। তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কয়েকদিনের মধ্যেই শতভাগ ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যাবে।

শহরের কুতুবদীয়া পাড়ার জেলে রেজাউল করিম জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে লকডাউনে পড়ে এমনিতেই জেলেদের দুর্দিন যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে চলে আসে সাগরে মাছ ধরার উপর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা। যে কারণে এ বছর জেলেদের খুবই মানবেতর দিন কেটেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পরে এ নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে। আমাদের রুটি-রুজির পথ খুলেছে। যে কারণে জেলে পল্লিগুলোতে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।

খুরুশকুল এলাকার নৌকা মিস্ত্রী আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি ১২ বছর ধরে নৌকা মেরামতের কাজ করে আসছি। দীর্ঘদিন ধরে নৌকা বন্ধ থাকায় অনেক নৌকা ভেঙে গেছে। সেগুলো মেরামত করার জন্য মালিকরা আমাকে নিয়ে আসছে। ঘাটের অনেক নৌকার কাজ করতে হচ্ছে আমাকে।

ট্রলার মালিক আব্দু শুক্কুর বলেন, দীর্ঘদিন নৌকা স্থলে পড়ে থাকায় ভাঙন ধরেছে। ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তবে এটা সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছি। কারণ এ বন্ধের ফলে সাগরে মাছ বৃদ্ধি পাবে। আশা করছি, জেলেরা এখন বেশি মাছ নিয়ে ফিরবে।

জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ফিশারিঘাট, কস্তুরাঘাট, কলাতলী ও দরিয়ানগর ঘাট থেকেই জেলার অধিকাংশ ট্রলার সাগরে যায়। বাকি ট্রলারগুলো জেলার অন্যান্য উপকূল থেকে সাগরে আসা-যাওয়া করে।

বোট মালিক সমিতি জানায়, সাগরে মাছ ধরা বড় নৌকায় ৩০ থেকে ৪০ জন এবং ছোট নৌকায় ৫ থেকে ১৭ জন জেলে থাকে। আবার কক্সবাজার শহরতলীর দরিয়ানগর ঘাটের ইঞ্জিনবিহীন ককশিটের বোটে থাকে মাত্র ২ জন জেলে। ট্রলারগুলোর মধ্যে ইলিশ জালের বোটগুলো গভীর বঙ্গোপসাগরে এবং বিহিন্দি জালের বোটগুলো উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরে।

ইলিশ জালের বোটগুলো পক্ষকালের রসদ নিয়ে এবং বিহিন্দি জালের বোটগুলো মাত্র একদিনের রসদ নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যায়। এসব জেলে বোটগুলো সাগর উপকূলে ছোট প্রজাতির মাছ ধরে, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাঁচকাড়া’ (পাঁচ প্রকারের) মাছ বলা হয়।

দরিয়ানগর বোট মালিক সমিতির সভাপতি নজির আলম বলেন, কলাতলী ও দরিয়ানগর ঘাটের ছোটবোটগুলো নিষেধাজ্ঞা অতিবাহিত হওয়ার পরই রবিবার মধ্যরাতে মাছ ধরতে রওনা দেবে এবং মাছ ধরে সোমবার সকালেই ঘাটে ফিরে আসবে। ফলে সোমবার সকাল থেকেই কক্সবাজারের মানুষ ফের সাগরের তাজা মাছের স্বাদ নিতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ইলিশ জালের বোটগুলো মাছ ধরে ফিরতে আরো ৫ থেকে ৭ দিন সময় নেবে বলে জানান মৎস্য ব্যবসায়ীরা।

কক্সবাজার শহরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ফিশারিঘাটস্থ মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির পরিচালক জুলফিকার আলী বলেন, রবিবার ও সোমবার থেকে ছোট মাছগুলো বাজারে পাওয়া গেলেও ইলিশ পেতে আরো ৫/৭ দিন সময় লাগবে। ট্রলারগুলো মাছ ধরে কয়েকদিন পর ঘাটে ফিরতে শুরু করলেই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম খালেকুজ্জামান বলেন, ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের প্রজননকাল উপলক্ষে সাগর ও নদী মোহনায় মাছ ধরার ওপর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। তা ২৩ জুলাই শেষ হয়েছে। এই সময়ে দেশের সামুদ্রিক জলসীমানায় সব ধরনের মৎস্য আহরণ, পরিবহণ ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। মাছের প্রজনন, উৎপাদন, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই মৎস্য আহরণের জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

খালেকুজ্জামান বলেন, সাগরে যেতে না পারায় কক্সবাজারে ৬৩ হাজার ১৯৩ জন জেলের জন্য প্রায় ৩ হাজার ৫৩৯ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী জেলার ৮ উপজেলায় তা বিতরণ করা হয়।

উল্লেখ্য, সাগরে মাছের প্রাচুর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২০১৯ সাল থেকে প্রথমবারের মতো ছোট নৌকাগুলোকেও ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় নিয়ে আসে। যদিও বা ইলিশের প্রজননকাল উপলক্ষে ছোট ট্রলারগুলো ২০১১ সাল থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। যেটি অক্টোবর মাসে এখনও কার্যকর রয়েছে। তবে ২০১৫ সাল থেকে কেবল বড় বড় বাণিজ্যিক ট্রলারগুলোর জন্যই এ নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন