• আজ শনিবার, ৩ আশ্বিন, ১৪২৮ ৷ ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ৷

কেউ খোঁজ রাখেনি, পল্লী বিদ্যুতের তারে বিদ্যুতায়িত পাপেলের ভরসা এখন হুইল চেয়ার

news523
❏ বুধবার, জুলাই ২৮, ২০২১ রংপুর

নাজমুস সাকিব মুন, পঞ্চগড় প্রতিনিধি- সময় ২৫ এপ্রিল ২০২০, অন্যদিনের মতো সেদিনও পল্লী বিদ্যুতের ১১ হাজার ভোল্ট পরিবাহী নতুন লাইন স্থাপনের কাজ করছিলেন পাপেল। তবে বাকী দিনগুলোর মতো সেদিন আর কাজ শেষে বাড়ি ফেরা হয়নি পাপেলর।

সাব স্টেশনে লাইন চালুর দায়িত্বে থাকা কর্মচারীর ভুলে বিদ্যুতায়িত হন পাপেল। নিমিষেই পাপেলের জীবন বদলে যায়, বরণ করতে হয় আজীবনের পঙ্গুত্ব। দুই পা আর এক হাত হারানো পাপেলের পরিবার এখন দিশেহারা।

দুই ভাই এক বোনের মধ্যে পাপেল মেজো। অষ্টম শ্রেণী পাশ পাপেল ২০১৫ সাল থেকে পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের অধীনে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করতেন। পল্লী বিদ্যুতের স্থায়ী কর্মচারী না হয়েও যথেষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই হরহামেশাই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতেন পাপেল।

সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেও পাপেলের ভাগ্যে জুটেনি পল্লী বিদ্যুত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা। ওই সময় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয় পাপেলকে। এরপর আরো আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিলেও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কথা রাখেননি। স্বল্প টাকায় চিকিৎসার তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় হুইল চেয়ারই এখন পাপেলের শেষ ভরসা।

মঙ্গলবার (২৭ জুলাই) উপজেলার পামুলি ইউনিয়নের কালুরহাট এলাকায় পাপেলের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, দুপুরে গোসল শেষে বাড়ির পেছনে আমগাছ তলায় হুইলচেয়ারে বসে আছেন তিনি। দিনের প্রায় পুরো অংশ কাটে এই আমগাছ তলায়। দেড় বছর পার হলেও পঙ্গু হাতের ক্ষত সারেনি। আহত হাতের হাড় (হিউমেরাস) ভেঙে প্রায় ইঞ্চি চারেক বেরিয়ে রয়েছে। প্রায় দেড় বছরেও শুকায়নি আহত হাতের ক্ষত, অর্থাভাবে করতে সম্ভব হয়নি আহত হাতের অস্ত্রোপচার।

সংবাদকর্মীদের পরিচয় জানার পর ছলছল চোখে নিজের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্বিষহ ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন পাপেল। দুর্ঘটনার পর কিছু দিন অফিস থেকে যোগাযোগ রাখলেও এখন আর কেউ খোঁজ নিতে আসেন না বলেই কেঁদে ফেলেন। টানাপোড়েনের সংসারে দুমুঠো ভাত খাওয়াই যেখানে কঠিন সেখানে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করার ইচ্ছে অলীক।

স্বাভাবিক জীবনে ফেরা আর কখনো সম্ভব না জেনেও পাপেল বলেন, কৃত্রিম পা আর কৃত্রিম হাতের ব্যবস্থা কেউ করে দিলে আর সবার সহযোগিতায় ছোট কোন ব্যবসা শুরু করতে পারলে বাকী জীবনটুকু কাটাতে পারতাম।

পাপেলের বাবা জসিবুল ইসলাম বলেন, অভাবের সংসারে খাওয়াই জুটে না ঠিকমতো ছেলের চিকিৎসা করব কেমনে। লকডাউন শেষ হলে ঢাকা নিয়ে যাব ভাবছি। কিন্তু টাকা জোগাড় হয়নি এখনো। স্থানীয় সাংসদ ও রেলমন্ত্রীর কাছে সহযোগিতার জন্য গেছিলাম। উনি একজন ডাক্তারকে সুপারিশ করেছেন ছেলের চিকিৎসার জন্য।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন মা পারুল বেগম। তিনি জানান, ছোট মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। বড় ছেলে এখনো বেকার। মেজো ছেলে অসুস্থ। দিনমজুর স্বামীর একার রোজগারে কোন মতো খেয়ে বেঁচে আছি। ছেলের প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য মেম্বারকে কতবার বলছি কিন্তু এখনো ভাতার ব্যবস্থা করে দেয় নি।

পামুলি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফজলে হায়দার বলেন, পাপেলের প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা এখনো করা সম্ভব হয়নি। তবে তাকে ভিজিডি’র কার্ড করে দেয়া হয়েছে। চলমান লকডাউনে সরকারি প্রণোদনা দেয়ার কথা জানান চেয়ারম্যান। অস্ত্রপোচারের সময় আর্থিক সহযোগিতারও আশ্বাস দেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যয় হাসান পাপেলকে সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলে জানান।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা গোলাম আজম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে পাপেলের পরিবার যোগাযোগ করলে তার প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দেয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব।

পল্লী বিদ্যুতের দেবীগঞ্জ জোনাল অফিসের এজিএম হাসানুল বান্নাহ বলেন, সেই সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তবে অস্থায়ী কর্মচারীদের কাজের পরিবেশ আরো সুরক্ষিত করার বিষয়ে আমরা সতর্ক থাকব।

পাপেলকে সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলতে তার ব্যক্তিগত ০১৭৬৩২৩৫০৮৮ এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

আরও পড়ুন :

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন