শায়েস্তাগঞ্জে নেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চিকিৎসায় দুরবস্থা

news52342
❏ শনিবার, আগস্ট ২১, ২০২১ সিলেট

মঈনুল হাসান রতন, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি- হবিগঞ্জের শায়েস্তাঞ্জে প্রস্তাবিত ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তিন বছরেও চালু করা হয়নি। এ অবস্থায় মাত্র একজন চিকিৎসক দিয়েই নতুন এই উপজেলার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে দেয়া হচ্ছে দেড় লক্ষাধিক মানুষের ‘নিয়মরক্ষার’ চিকিৎসা।

দেশের ৪৯২তম উপজেলা শায়েস্তাগঞ্জের আয়তন প্রায় সাড়ে ৩৯ বর্গকিলোমিটার। যার মাঝে রয়েছে একটি পৌরসভা ও তিনটি ইউনিয়ন। এছাড়াও জেলার শিল্পাঞ্চল হওয়ায় ব্যস্ততম স্থান হিসেবে দেশের নানা প্রান্তের লোকজনের পদচারণ রয়েছে শায়েস্তাগঞ্জে। অথচ এখানে নেই একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

নতুন এ উপজেলায় ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রস্তাবিত থাকলেও সেটা চালু হয়নি তিন বছরেও। ফলে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মাত্র একজন চিকিৎসক দিয়ে দেয়া হচ্ছে দেড় লক্ষাধিক মানুসের চিকিৎসা। এমন অবস্থার মাঝে সাধারণ মানুষদেরকে চিকিৎসা নিয়ে মারাত্মক বেগ পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে এই করোনাকালে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। উপজেলা থেকে জেলায় গিয়ে করোনার টেস্ট করার কারণে অনেকেই করোনা টেস্ট করেননি। এছাড়া মহামারীর সময়ে ও লকডাউন থাকাকালীন উপজেলার গর্ভবতী মায়েরাও পাননি সঠিক চিকিৎসা। এতে করে ঝুঁকির মুখেই ছিল শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য।

অন্যদিকে লকডাউনের সময় ঢাকা সিলেট থেকে প্রাইভেট চিকিৎসকরাও শায়েস্তাগঞ্জে আসেননি। ফলে এ উপজেলার বেশিরভাগ প্রাইভেট ক্লিনিকও ছিল বন্ধ। কেউ অসুস্থ হলে উপজেলা উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক সেবা পেলেও গুরুতর হলে যেতে হয় জেলা সদর হাসপাতালে। এতে পদে পদে নানা দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সেবা গ্রহিতাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত ৫০ শয্যা শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফ মিলে মোট ৪৭টি পদের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু এত কম সংখ্যক লোকবল দিয়ে ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল পরিচালনা সম্ভব নয়। তাই ইতোমধ্যে হবিগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস থেকে ১১১টি পদ সৃষ্টি করার জন্য লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আর জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবন নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে লোকবল নিয়োগ দেওয়ার কার্যক্রমও থেমে আছে।

এ অবস্থায় শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার এক একর জমির উপর অবস্থিত শায়েস্তাগঞ্জ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি রুম মেরামত করে সেখানে চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম। দেড় লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা তিন বছর ধরে চলছে মাত্র একজন মেডিকেল অফিসার দিয়ে। তাকে সহায়তা করছেন একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, একজন অফিস সহকারী ও একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার।

সেবা নিতে আসা আল মাহমুদ বলেন, ‘শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা হয়েছে, তাহলে কেন হাসপাতাল হবে না। দ্রুত প্রস্তাবিত ৫০ শয্যা হাসপাতাল চালু করা হোক।’ একই দাবী জানালেন রোগী ফেরদৌসি আক্তারও।

উপজেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন রুমি বলেন, ‘এ সরকার ক্ষমতায় এসে পর্যায়ক্রমে শায়েস্তাগঞ্জকে উপজেলা করে দিয়েছে। এটা এলাকার মানুষের অনেক বড় প্রাপ্তি। অথচ আমি নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে শায়েস্তাগঞ্জে চিকিৎসা নিতে পারিনি। নানা প্রতিকূলতার মাঝেই হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। যদি আমাদের শায়েস্তাগঞ্জে হাসপাতাল থাকত তাহলে আমাকে এতদূরে যেতে হতো না।’

শায়েস্তাগঞ্জ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার শেখর কুমার চন্দ্র বলেন, এ কেন্দ্রটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। শায়েস্তাগঞ্জসহ এর আশপাশ এলাকার রোগীরা এসে বিনামূল্যে সরকারি ওষুধ ও সেবা পাচ্ছে। তিন বছর ধরে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রমও চলে আসছে এখানে। জমি অধিগ্রহণের পর ভবন নির্মাণ হলে হাসপাতালের পুরোপুরি কার্যক্রম চালু হবে।

উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বসে নতুন উপজেলার দেড় লক্ষাধিক বাসিন্দার চিকিৎসাসেবা সামাল দিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাদ্দাম হোসেন।

তিনি জানান, ‘করোনার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ জনের মত রোগী দেখেছি। এতো রোগী সামাল দেয়া আমাদের পক্ষে কঠিন ছিল, তবুও আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি।’

শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ গাজীউর রহমান ইমরান বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে উপজেলার জন্য যেখানে কমপক্ষে ১০ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সেখানে ডা. মো. সাদ্দাম হোসেন একাই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জরুরিভাবে আরও কয়েকজন চিকিৎসক উপজেলায় নিয়োগের দাবি জানান।

এ বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ তালুকদার ইকবাল বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য জমি অ্যাকুয়ার করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। আমি আশা করছি, জমি অধিগ্রহণ শেষ হলে খুব শীঘ্রই সরকারি বরাদ্দ সাপেক্ষে উপজেলা ভবন ও ৫০ শয্যা শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চালু হয়ে গেলে উপজেলার স্ব্যাস্থ্য ব্যবস্থা ও উন্নতি হবে।’

উল্লেখ্য, বিগত ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ নিউফিল্ডে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক জনসভায় ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শায়েস্তাগঞ্জকে উপজেলা ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১৭ সালের ২০ নভেম্বর নিকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উপজেলা হিসেবে শায়েস্তাগঞ্জকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ২০১৯ সালের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত হয় শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন