লোকে লোকারণ্য কক্সবাজার, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে উদাসীন পর্যটক

cox's bazar n43
❏ শনিবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২১ চট্টগ্রাম, দেশের খবর, ফিচার

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: মাস্ক সঙ্গে থাকলেও অনেকেই ব্যবহার করছেন না। কারো পকেটে, কেউ হোটেল রেখে এসেছেন, আবার কেউ থুতনিতে ঝুলিয়ে রেখেছেন। স্বাস্থ্য বিধি মানতে অনেকেই উদাসীন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকরা।

করোনা মহামারি দীর্ঘ সাড়ে ৪ মাসেরও অধিক সময় জনবিচ্ছিন্ন ছিল কক্সবাজারের পর্যটন স্পটগুলো। করোনা প্রাদুর্ভাবে গত ১৯ আগষ্ট থেকে বন্ধ হওয়া পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৪ মাস পর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যবিধি মানা সাপেক্ষে চালু হওয়া পর্যটনে এখন সরগরম। তবে আগত পর্যটকরা স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদাসিন।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতসহ সব পর্যটন স্পট উন্মুক্ত করে দেয়ার পর কক্সবাজারে বাড়ছে পর্যটকের ভিড়। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকের আগমন বাড়ছে কয়েকগুণ। তবে কোথাও নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই। পর্যটক থেকে শুরু করে সৈকতের ব্যবসায়ীরা মানছেনা করোনার সরকারি বিধি-নিষেধ। করোনা মহামারিতে প্রায় সাড়ে ৪ মাস পর্যটক শূণ্য ছিল সৈকত শহর কক্সবাজার। তবে বিধি-নিষেধ দিয়ে সকল পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়ার পর চিরচেনা রূপে ফিরছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত।

প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকের আগমন। বিশেষ করে; সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকের আগমন বাড়ছে কয়েকগুণ। সবাই মেতে উঠছেন সাগর তীরে; করছেন আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়।

ঢাকা হতে আগত পর্যটক নাইমুল ইসলাম বলেন, আশা করিনি কক্সবাজার সৈকতে এতো মানুষ আসবে। মনে করেছিলাম অল্প মানুষ আসবে। এখন দেখতে সৈকতে অনেক মানুষ। অসম্ভব ভাল লাগছে।
আরেক পর্যটক আলা উদ্দিন বলেন, সৈকতে অনেক মানুষ। যেটা কল্পনা বাইরে। যদি মানুষ কম হতো, তাহলে ঘোরাঘুরিতে একটু মজা পেতাম। কিন্তু মানুষ বেশি হওয়াতে বেশি ঘোরাফেরা করা যায়নি।

তবে আগত পর্যটকরা মানছেন না সেই নির্দেশনা। ব্যবহার করছেন না মাস্ক। সৈকতের বালিয়াড়িতেও একই অবস্থা। পর্যটক থেকে শুরু করে সৈকতের ব্যবসায়ীরা উদাসীন স্বাস্থ্যবিধি মানতে। ক্যামেরা দেখলেই দেন নানা অজুহাত।
সৈকতের ঘোড়াওয়ালা মামুন বলেন, মাস্ক এখনই নিয়েছিলাম। কিন্তু নাস্তা করার জন্য খুলে ফেলে দিয়েছি। তবে এখনই কিনে নিচ্ছি।

পর্যটক রেজাউল্লাহ বলেন, সাগরে গোসল করতে নামব; তাই মাস্ক খুলে পকেটে নিয়েছি। গোসল করা শেষে আবারও পকেট থেকে মাস্ক নিয়ে ব্যবহার করব। আরেক পর্যটক সাকিবুর রহমান বলেন, মাস্ক পরার কথা আরকি! কিন্তু মাস্ক কেনা হয়নি আর তাই মুখে পরাও হয়নি। মাস্ক না পরাটা ভুল ছিল।

তবে পর্যটক আগমন বাড়ায় স্বস্তিতে হোটেল মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস মালিকরা। বলছেন; সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তারা হোটেল পরিচালনা করছেন।

কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে রয়েছে, যেখানে অর্ধ লক্ষ পর্যটক অবস্থান করতে পারেন। সাপ্তাহিক ছুটিতেও প্রায় লাখো পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিংয়ে জমজমাট ব্যবসা করছে তারকা হোটেলগুলো।

কক্সবাজার বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি সূত্র জানায়, আগত পর্যটকদের সেবা নিশ্চিতে সর্তক অবস্থায় দায়িত্বপালন করছে ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। সাপ্তাহিক ছুটিতে পর্যটক সমাগম বাড়ে দেখে মোতায়েন রাখা হয় অতিরিক্ত পুলিশও। পর্যটক হয়রানি রোধে পর্যটন স্পটগুলোকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত সাধারণ চিকিৎসা ও খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে সমুদ্র সৈকতে। গোসলকরাকালীন বিপদাপন্ন পর্যটকদের রক্ষার্থে সর্তক অবস্থায় রয়েছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আসা পর্যটক আসলাম অনিক জানান, করোনা একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন কোথাও যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাড়ির সবাই আতঙ্ক নিয়ে কাটিয়েছি দীর্ঘ ১ বছর। তাই মানসিক প্রশান্তির আশায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে সৈকতের নোনাজলের সান্নিধ্য নিতে এসেছি। পরিবারসহ খুবই মজা করছি।

সি-সেইফ লাইফগার্ড সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান বলেন, প্রতিদিন পর্যটকরা সৈকতে ভিড় বাড়াচ্ছে। শুক্র ও শনিবার এ মাত্রা বাড়ে। করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রতিনিয়ত মাইকিং করা হলেও বালিয়াড়িতে আসা পর্যটকদের অধিকাংশই মাস্ক পরে না। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় অব্যাহত রাখলেও পর্যটকরা সচেতন হচ্ছেন না।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ ইসলাম জানান, পর্যটক হয়রানি বন্ধে হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মূল্য তালিকা টাঙানোর নির্দেশনা আগেই দেওয়া ছিল। সমুদ্র সৈকতের লাবনী, সুগন্ধা, কলাতলীসহ ১১টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে তথ্য কেন্দ্র (ইনবক্স)। পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে একটি হটলাইন নম্বর (০১৭৩৩৩৭৩১২৭)। যে কোনো অভিযোগ এখানে করতে পারবে পর্যটকরা। হটলাইনের সেবা নিয়ে ইতোপূর্বে অগণিত পর্যটক হয়রানির বিচার পেয়েছেন। জরিমানা করা হয়েছে কয়েকটি রেস্তোরা ও হোটেলকে। এখন করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সর্বদা সচেতনতা মূলক মাইকিং ও প্রয়োজনে ভ্রমমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময় সর্তকাবস্থায় রয়েছে পুলিশ। পর্যটকরা যাতে কোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার না হন, পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোষাকে এবং পর্যটক বেশে পুরুষ-মহিলা পুলিশের সংখ্যাও সৈকতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, স্ব্যাস্থ্যবিধি মানাতে মাইকিংসহ নানান ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকত এলাকায় পোশাকধারী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ রেসকিউ টিম, ইভটিজিং কন্ট্রোল টিম, ড্রিংকিং জোন, দ্রুত চিকিৎসাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তায়। সৈকতে বিচ বাইক নিয়ে টহল অব্যাহত রেখেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। রয়েছে ৩টি বেসরকারি লাইফ গার্ড সংস্থার অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী। কন্ট্রোল রুম, পর্যবেক্ষণ টাওয়াসহ পুরো সৈকতে পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা চিন্তা মাথায় রেখে অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হয়। সামনে পর্যটন মৌসুম আসছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনা রোধের পাশাপাশি পর্যটনটাও এগিয়ে নিতে হবে। সেভাবেই পর্যটন সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত দেওয়া রয়েছে। সবাই আন্তরিক হলে পর্যটন ব্যবসা ঠিক রেখে করোনা রোধ সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন