🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ শনিবার, ৩ আশ্বিন, ১৪২৮ ৷ ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ৷

পোকা দমনে কক্সবাজারে পার্চিং পদ্ধতি

Cox's Bazar news
❏ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২১ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: কীটনাশক ছাড়া এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রেখে কক্সবাজার সদরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানক্ষেতের পোকা-মাকড় দমন ও বংশ বিস্তার রোধে এবার পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন কৃষকরা।

জমির মাটি, ফসল ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের পরিবর্তে ক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতির ব্যবহারের প্রতি এখানকার কৃষকদের আগ্রহ অনেকাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পদ্ধতি ব্যবহার বাড়াতে কৃষি বিভাগ কৃষকদের সচেতন করছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে একদিকে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে কায়িক শ্রমও দিতে হচ্ছে কম। জমিতে পাখির অবস্থান স্থাপনা করে পাখির মাধ্যমে ধানের ক্ষতিকর পোকা নিধনের জন্য এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।

গতকাল সোমবার সদর ও রামু উপজেলার কয়েক ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন মাঠে ঘুরে দেখা যায়, কৃষক ধান ক্ষেতে পোকা দমনে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি পুতে রেখেছে এবং ওইসব ডালে ও কঞ্চিতে পাখিরা বসে বিভিন্ন পোকামাকড় ধরে খাচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পার্চিং একটি কার্যকর পোকা দমন ব্যবস্থা। এতে কৃষক যেমন স্বল্প পরিশ্রমে লাভবান হয়। এই পদ্ধতিটি এলাকার প্রতিটি কৃষকগন ব্যাপকভাবে গ্রহণ করছে এবং ভালো উপকার পাচ্ছেন। এতে করে এলাকার কৃষকগণ উপকারি ও অপকারি পোকা সহজে চিনতে পারছে। এলাকার কৃষকেরা যে কোন পোকা দেখলেই কীটনাশক দিতে হবে এই ধারনা যে ভুল তা সহজেই বুঝতে পারছে।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৭৮ হাজার ৯শ ২৫ হেক্টর জমিতে রোপা-আমন আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তিন লাখ ৪৪ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন চাল। কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছনোর উদ্দেশে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও পদ্ধতির ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পার্চিং অগ্রগামী। আগে ফসলে পোকা-মাকড় রোধে কীটনাশক ব্যবহার করা হতো। এতে একদিকে যেমন ব্যয়বহুল ছিলো, অন্যদিকে ছিলো ঝুঁকিপূর্ণ। সূত্র জানায়, জেলায় মোট ৫৬ হাজার ৮২৬ হেক্টর জমিতে কৃষকরা পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

পার্চিং হলো ফসলের জমিতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা। ক্ষেতে গাছের শুকনো ডাল বা বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করে পাখি বসার জন্য ফসল থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থান তৈরি করা হয়। এটি সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার একটি উত্তম পরিবেশ বান্ধব যান্ত্রিক কৌশল। সাধারণত ফসলের চেয়ে এক ফুট বেশি উচ্চতায় পাঁচ শতকে একটি করে ডাল বা কঞ্চি পুঁততে হয়। পাখিরা ধানের জমিতে এসব ক্ষতিকর পোকাসহ কীটপতঙ্গ খায়। ফলে মাঠে ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা কমে যায় এবং পোকার বংশ বিস্তার রোধ হয়।

পার্চিং পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে সদর ও রামুর বিভিন্ন এলাকা এবং উপজেলাসহ সংশ্লিষ্ট কৃষি এলাকায় কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের নিয়ে পার্চিং উৎসব করেছেন এবং পার্চিংয়ের প্রায়োগিক দিক ও উপকারিতা সম্পর্কে অবহিত ও উদ্বুদ্ধ করেছেন।

সদরের পশ্চিম মুক্তারকুল এলাকার কৃষক আবু ছৈয়দ জানান, আবাদকারী আব্দুস সালামের মতো এবারো দেড় বিঘা বোরো জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। পিএমখালীর কৃষকরা জানান, এ পদ্ধতিতে অনেক ক্ষতিকর পোকার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এখন পাখির সংখ্যা অনেক কম বলে পুরোপুরি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন কৃষকরা।

রামুর ফঁতেখারকুল ইউনিয়ের কৃষক ইলু রহমান এবার চার বিঘা জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন। তিনি সম্পূর্ণ খেতে পার্চিং করেছেন। তিনি বলেন, চার বিঘা জমির আমন ধানখেতে তিনি গাছের ৩০টি ছোট ডাল ও বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দিয়েছেন। ফিঙে ও শালিক ওই ডালে বসে খেতের ক্ষতিকর পোকা, বিশেষ করে মাজরা পোকার মথ ধরে খেয়ে ফেলছে। এতে ভালো কাজ হচ্ছে, কীটনাশক ব্যবহার অনেক কমেছে। এ ছাড়া রাতে পার্চিংয়ে পেঁচা বসে খেতের ইঁদুর ধরছে। আলের ওপর প্রায় প্রতিদিনই পেঁচায় খাওয়া ইঁদুরের মাথা পাওয়া যাচ্ছে। ইঁদুর দমনে পার্চিং ব্যাপক কাজ করছে বলে মত দেন ওই এলাকার কৃষক রফিক আলম।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: জাহিদ হাসান বলেন, একটি মাজরা পোকার স্ত্রী মথের পেটে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ ডিম থাকে। এ পোকা ধান গাছের গোড়ায় কুশি কেটে দেয়, ধানে চিটা হওয়ার কারণও এ পোকা। পাখির প্রিয় খাবার মাজরাসহ অন্যান্য পোকা।

তিনি জানান, উপজেলায় বোরো ধানের আবাদি জমির ৭০ শতাংশ পার্চিং সুবিধার আওতায় এসেছে। এতে করে পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের অপব্যবহার রোধ হওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও তাদের এক মণ ধানের সমপরিমান অর্থের সাশ্রয় হওয়া সম্ভব।

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ এখলাছ উদ্দিন আরও বলেন, পার্চিংসহ অন্যান্য প্রযুক্তি ও পদ্ধতি কৃষকদের অবহিত এবং উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বোরো ধান উৎপাদনে সমৃদ্ধি আনার প্রচেষ্টায় নিরলসভাবে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন