• আজ বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২১ অক্টোবর, ২০২১ ৷

সোনারগাঁয়ে অযত্ন অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে হোসেন শাহি মসজিদ

mosq n23
❏ সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১ ইতিহাস-ঐতিহ্য, ঢাকা, দেশের খবর

সুমন আল হাসান, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি- নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মোগল আমলের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক ঈসা খাঁর রাজধানী ছিল। এখানে বারোভূইঁয়া প্রধান ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁ এবং পূর্ববর্তী স্বাধীন সুলতানরা রাজত্ব করতেন।

এ সময় তারা রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় মনোরম ইমারত, মসজিদ, খানকা ও সমাধি নির্মাণ করেন। তাদের প্রত্যেকটি মসজিদ, খানকা ও সমাধিতে মুসলিম ঐতিহ্যগত আরবীয় অলঙ্করণ পরিলক্ষিত হয়। এই সব প্রাচীন কীর্তির প্রত্যেকটি মসজিদ, খানকা ও সমাধি ছোট-বড় মূল্যবান পাথর খণ্ডে সুসজ্জিত।

সোনারগাঁ বর্তমানে ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত কতগুলো গ্রামের সমষ্টি মাত্র। পানাম, আমিনপুর, গোয়ালদী, মোগরাপাড়া, দমদমা, ভাগলপুর, শাহচিল্লাহপুর, মহজমপুর এসব গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন সুর্বণগ্রাম, নব্য বিকাশিকা, সম্রাট আকবরের প্রিয় নগরী জান্নাতুল বিলাদ অথবা হজরত জাল্লাল সোনারগাঁয়ের সেই গৌরবোজ্জ্বল ও রোমাঞ্চকর ইতিহাসের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব গ্রামের অন্যতম হলো গোয়ালদী। এ গ্রামে সে সময়কার গৌরবময় দিনের যে সব নিদর্শন বর্তমানে বিদ্যমান রয়েছে তার অন্যতম হোসেন শাহী মসজিদ।

ইতিহাসে পূর্ব বাংলায় হোসেন শাহী আমলকে পরিচয় করে দেয়া হয়েছে স্বর্ণ যুগ হিসেবে। কারণ এ সময়কার আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন এক অনন্য সাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন সুলতান। স্থাপত্যের প্রতি ছিল তার প্রগাঢ় অনুরাগ। তিনি নির্মাণ করে গেছেন অসংখ্য মনোমুগ্ধকর মসজিদ ও মাদরাসা। এ সময় বিভিন্ন স্থানে যেসব মসজিদ নির্মিত হয়, তার মধ্যে এই ঐতিহাসিক গোয়ালদী মসজিদ অন্যতম।

বর্তমানে মসজিদটি দেখার জন্য প্রতিদিন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী ও পর্যটক আসেন সোনারগাঁয়ে। এখানকার বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের হৃদয় জুড়াতে সক্ষম এমন অসংখ্য পুরাকীর্তির নিদর্শনের মাঝে হোসেন শাহী মসজিদ অন্যতম। এ মসজিদটির মনোরম নির্মাণশৈলী অনায়াসে দর্শনার্থীদের হৃদয় আকৃষ্ট করে। কিন্তু সংস্কারের অভাবে এখন এটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইট-সুরকি খসে পড়ছে এবং মূল কাঠামো থেকে সরে যাচ্ছে মসজিদের খিলান।

তারপরও কর্তৃপক্ষের নজর পড়ছে না মসজিদটি সংস্কারের মাধ্যমে সংরক্ষণের। নোটিশ বোর্ড টানিয়ে প্রত্নতত্ত্বিক সম্পদ চিহ্নিত করেই যেন যথাযথ দায়িত্ব পালন সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে অযত্নে ও অবহেলায় পড়ে থাকলে ক্রমান্বয়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে প্রত্নতত্ত্ব সমৃদ্ধ এই মসজিদ। এতে সোনারগাঁ হারাতে বসেছে তার এক অনুপম নিদর্শন।

জানা গেছে, আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে মোল্লা হিজবার আকবর ৯২৫ হিজরির ১৫ শাবান মোতাবেক ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ আগস্ট এ মসজিদ নির্মাণ করেন। হোসেন শাহ ৯০৫ হিজরি থেকে ৯২৭ হিজরি পর্যন্ত রাজত্ব করেন এবং তিনি বাংলার সুলতানদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কারুকার্যময় মসজিদটি নির্মাণের পর দীর্ঘদিন দর্শনীয় ইবাদতের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার এক পর্যায়ে সংস্কারের অভাব ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়। পরে তা আবার নির্মাণ করা হয়। পুনর্নির্মাণের আগে মেহবার ও দেয়ালের কিছু অংশের অস্তিত্ব ছিল। গোয়ালদী গ্রামে মসজিদটি নির্মিত হয় বলে এটির নাম দেয়া হয় গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ। সোনারগাঁয়ে যেসব মুসলিম স্থাপত্য নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে প্রাচীন আরবীয় শিল্পরীতিতে নির্মিত এই মসজিদটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

মসজিদ সম্বন্ধে জেমস ওয়াইজ এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নালে এবং স্যার কালিংহাম ১৮৭৯ সালে সার্ভে অব ইন্ডিয়া রিপোর্টে বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ আগের মতো করে মসজিদটিকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। গৌঢ়, পান্ডুয়াও বাংলার অন্যান্য ইমারতাদির মতো এই মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালের পাথর ও ইটে আরবীয় অলঙ্করণ পরিলক্ষিত হয়। ইট ও পাথরের মূল অলঙ্করণের কিছু নিদর্শন মসজিদের পশ্চিম দেয়াল, বিশেষত মিহরাবে লক্ষ করা যায়। মসজিদের মেহরাবের গায়ে ফুল, লতাপাতা আঁকা বিভিন্ন নকশা এবং আরবি লিপির অলঙ্করণ। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি চমৎকার।

এটি কালো পাথরে নির্মিত ও কারুকার্য খচিত। মসজিদের আয়তন বাইরের দিকে দৈর্ঘ্য প্রস্থ ২৬ ফুট করে। পলেস্তারা ছাড়াই চিকন ইটের তৈরি বর্গাকার এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির ভেতরের প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য সাড়ে ১৬ ফুট এবং দেয়ালগুলো প্রায় পাঁচ ফুট প্রশস্ত। দেয়ালের উভয় দিকে অতিসুন্দর পোড়ামাটির চিত্রফলক, মসজিদের চারকোণায় রয়েছে চারটি গোলাকার মিনার। মিনারগুলো মেঝের সমান্তরাল থেকে ভূমির দিকে কয়েকটি স্তরে ক্রমেই মোটা। দীর্ঘদিনের প্রত্নতত্ত্ব ও মেরামতের অভাবে গম্বুজের বেশির ভাগ ও উত্তর-পূর্ব দক্ষিণ দেয়ালের উপরাংশ বিলুপ্ত হয়ে যায়। সম্ভবত এই কারণে মসজিদটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

সূত্রে আরো জানা গেছে, আশির দশকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এ শাহী মসজিদটিকে প্রত্নতত্ত্বের আওতাভুক্ত করে এটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। সে সময় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার করে। এতে ফুল, লতাপাতা নকশা সংবলিত পোড়ামাটির ফলক স্থাপন করা হয়। এখন মসজিদটির প্রকৃত রূপ অনেকটাই বদলে যায়। মসজিদের গায়ে যেসব মূল্যবান কারুকাজ খচিত পাথরের ফলক ছিল সেগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আওতাভুক্তির আগেই চুরি হয়ে গেছে। বর্তমানে মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে।

স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ হেলাল উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, পাঁচ শ’ বছরের বেশি পুরনো ঐতিহাসিক মসজিদটি ইতিহাসের সাক্ষী। এটিকে গুরুত্বসহকারে সংরক্ষণ করা উচিত। সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন পুরার্কীতি পরিদর্শনে আসা দেশী-বিদেশী পর্যটকরা এ মসজিদটি পরিদর্শন না করে বাড়িতে ফেরেন না।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক রাখী রায় জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত রয়েছেন। এটি সংস্কারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন