🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ রবিবার, ৮ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২৪ অক্টোবর, ২০২১ ৷

ফুলবাড়ীতে করোনাকালে এক বিদ্যালয়েই ৮৫ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার!

school enw
❏ সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১ দেশের খবর, রংপুর

অনিল চন্দ্র রায়, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা- দেশের উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮৫ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। তারা কম বয়সেই এখন স্বামীর বাড়ীতে ঘর-সংসার করছে।

সচেতনমহলের দাবী, দারিদ্রতা, যোগাযোগ বিচ্ছন্নতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার জন্য এ উপজেলায় বাল্যবিয়ের হার হু-হু করে বেড়েই চলেছে। কোন ক্রমেই ঠেকানো যাচ্ছে বাল্যবিবাহ। তবে সংশ্লিষ্টরা জরিপ করে প্রকৃত বাল্যবিয়ে এবং শিশু শ্রমে যাওয়া শিক্ষার্থী সংখ্যা নির্ণয় করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সোমবার সকালে উপজেলার বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গেলে, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মূহা: মতিউর রহমান খন্দকার জানান, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৩৪৫ জনের মধ্যে ৮৫ জনের বাল্যবিয়ে হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে- ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ২, সপ্তম শ্রেণীতে ১১, অষ্টম শ্রেণী ১৭, নবম শ্রেণীতে ২৮, দশম শ্রেণী ১৪ ও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী ১৩ জন। করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আগে এই বিদ্যালয়ে প্রতিদিন গড়ে শিক্ষার্থীর উপস্তিতি ৭০-থেকে ৯০ শতাংশ হলেও এখন উপস্থিতি হচ্ছেন ৪০-৫০ শতাংশ।

ঐ প্রতিষ্ঠানের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নুপুর, আশামনি, নাছিমা ও আতিকা খাতুনসহ অনেকেই জানান, তারা ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনেই তাদের ১৭ জন বান্ধবীর বিয়ে হওয়ার খবর শুনে তাদের সবার মন খারাপ হয়ে যায়। অনেক দিন পর বিদ্যালয় খোলার আনন্দের চেয়ে মন খারাপেই ছিল। বলেন, তারাও খুব দুশ্চিন্তায় ভুগছেন।

একই প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমী আক্তার বলেন, অনেকদিন পর স্কুল খুললো সব বান্ধবীর সঙ্গে মজা করবো, আনন্দ করবো কি আনন্দ। কিন্তু সেটা আর হলো না। স্কুল এসে দেখলাম আমার ২৮ জন বান্ধবী স্কুলে আর আসছে না। খুবেই খুবেই মন খারাপ হলো। পরে জানতে পারি আমার ২৮ জন বান্ধবীসহ আমার স্কুলের ৮৫ থেকে ৯০ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। জানি না আমার ভাগ্যে কি হবে।

ঐ প্রতিষ্ঠানের বাল্যবিয়ের শিকার নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী বিথী খাতুনের বাবা ভ্যান চালক বাদশা মিয়া জানান, বাহে আমরা গরীব মানুষ। ভ্যান চালিয়ে জীবন-জীবিকা করি। জানেনতো গরীব মানুষের দোষ বেশি। ভাল একনা আলাপ আসছে তাই মোর মেয়েটা বিয়ে দিছং বাহে।

একই প্রতিষ্ঠানের বাল্যবিয়ের শিকার নিলুফা ইয়াসমিনের বাবা সাই-মেকার বাবলু মিয়া জানান, দেখতেছেন তো কোন রকম মানুষের সাইকেল ভাল করেই যা পাই তা দিয়েই কোন রকমেই চলে সংসার। দেশে করোনা আসিয়া আমরা খুব কষ্টে ছিলাম। কোন সহযোগীতা পাইনি। দেখতে দেখতে মেয়েটাও বড় হয়ে গেল দুচিন্তার যেন শেষ নেই। তা একনা ভাল সমন্ধ পাওয়ায় আর দেড়ি করি নাই, সাথে সাথে মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি। তবে বাল্যবিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

এ ব্যাপারে বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহা: মতিউর রহমান খন্দকার জানান, বিদ্যালয় খোলার পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকায় আমরা শিক্ষকরা প্রতিটি শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ খবর শুরু করেছি। যেসব শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে গেছে আমরা তাদের বাড়িও যাচ্ছি। ওইসব শিক্ষার্থী যাতে স্কুলে আসে সে ব্যাপারে তাদের অভিভাকদের সচেতন করছি। করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। এই সুযোগে পরিবার তাদের বাল্যবিয়ে দিয়েছেন। আমরা শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য কাজ করছি।

জানা যায়, প্রধান শিক্ষক করোনার আগেই গত দেড় বছরেই তার স্কুলের ২৫ থেকে ৩০ জন্য শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছেন। কিন্তু করোনাকালে খবর না পাওয়ায় গোপনে তার প্রতিষ্ঠানের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ের শিকার হন।

বড়ভিটা ইউনিয়ন পরিশদের চেয়ারম্যান মো.খয়বর আলী জানান, করোনার কারণে আমার ইউনিয়নে বাল্যবিয়ে বেড়েছে। আমরা এজন্য পদক্ষেপ নিচ্ছি। যাতে প্রশাসনের সহযোগী আমরা পাড়ায় মহল্লায় বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে মতবিনিময়সহ সচেতনমূলক প্রচার চালানো হবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো.আব্দুল হাই জানান, বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বাল্যবিয়ের তথ্যটি পেয়েছি। এ উপজেলায মোট ৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বাল্যবিয়ের প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবকদের সাথে মতবিনিময় করে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়াতে শিক্ষকদের নিদের্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন দাস জানান, তিনি বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮৫ জন শিক্ষার্থীর বাল্যবিয়ের বিষয়টি শুনেছেন। বাল্যবিয়ে কিভাবে প্রতিরোধ করা যায় সে বিষয়ে সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন ধরণের প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে আমরা কাজ শুরু করেছি। প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিসহ সুশীল সমাজর প্রতিনিধিকে নিয়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানান। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করার কাজ করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন