• আজ বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২১ অক্টোবর, ২০২১ ৷

প্রাণ ফিরে পেল ‘মরা নদী’

river n34n
❏ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১ দেশের খবর, রংপুর

সাইফুল ইসলাম মুকুল, রংপুর ব্যুরো- সম্প্রতি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া ‘মরা তিস্তা’ আর ‘ঘিরনই নদী’ খনন করা হয়েছে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া শাখা এ নদী দুটির ১৭ কিলোমিটার অংশ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে। এতে করে প্রায় দুইশ বছর পর জেগে উঠছে মরা তিস্তা নদী। সঙ্গে প্রাণ ফিরে হাসছে ঘিরনই নদী।

অথচ কিছু দিন আগেও এ নদী দুটি ছিল অস্তিত্বহীন। এবার শুধু নদী খনন নয়, দুই পাড় সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়নে তীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।

এদিকে দখল, দূষণ আর আবাসনে মৃত্যু হচ্ছে একেকটি নদীর। কখনও আবার ভূমিকম্প ও ভয়াবহ বন্যায় গতিপথ বদলে নদী হারিয়েছে স্বাভাবিক গতি। প্রাণহীন নদীতে বসেছে মানুষের ভাগ। দখল তাণ্ডবে নদীর বুকে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, পুকুর, ধানি জমি। রংপুরে এমন নিখোঁজ নদীর প্রাণ ফেরাতে কাজ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।

এখন মরা তিস্তা নদীর বুকে খেলা করে হাঁস। বেড়েছে বক, পাতি সরালি, মাছরাঙার আনাগোনা। হরেক রকম পাখির দেখা মিলছে মরা তিস্তার বুকে। যমুনেশ্বরী নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে ফসল বোঝাই করে নৌকাও চলতে দেখা গেছে মরা তিস্তায়।

নদী গবেষক ও নদী আন্দোলন সংগ্রামীরা বলছেন, জলের আধার, আমিষের উৎস এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে উদ্ধার হওয়া এ নদীটি। হারিয়ে যাওয়া মরা তিস্তা নদী তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। নদী উদ্ধারে মরা তিস্তা হতে পারে দৃষ্টান্ত এমনটাই দাবি তাদের।

স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ১৭৭৬ সালের রেনেল মানচিত্রে প্রদর্শিত তিস্তার একটি শাখা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার দক্ষিণাংশ থেকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলা দিয়ে প্রবেশ করে। নদীটি নীলফামারী জেলা অতিক্রম করে রংপুর জেলার তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিঠাপুকুর উপজেলার শেষভাগে করতোয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। রেনেল মানচিত্রে এ নদীকে তিস্তা নামেই উল্লেখ করা হয়েছে।

১৭৮৭ সালে ভূমিকম্প ও ভয়াবহ বন্যায় গতিপথ পরিবর্তন করে তিস্তা। এর ফলে উত্তরবঙ্গের নদীগুলো স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে। শাখা এ নদীটি তিস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা নামটি বিলুপ্ত হয়ে এলাকাভিত্তিক চাড়ালকাটা, যমুনেশ্বরী ও দেওনাই নামে পরিচিতি পায়। একইসঙ্গে এর অংশ দখলদারদের কুনজরে পড়ে সংকীর্ণ হতে থাকে। বন্ধ হতে থাকে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ।সময়ের পরিবর্তনে অনেকে নদীর মালিক হয়ে যায়।

বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ‘মরা তিস্তা’ ও ৩ দশমিক ২৬৫ কিলোমিটারের ‘ঘিরনই নদী’ দুটি উদ্ধারের পর তা খনন করা হয়েছে। সঙ্গে মরা তিস্তার উৎসমুখ চিকলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করে বদরগঞ্জ উপজেলা পরিষদ, সর্দারপাড়া, বানিয়াপাড়া, কুমারপাড়া, শংকরপুর, ঝাড়পাড়া, সরকারপাড়া, কালুপাড়া ও বৈরামপুর অতিক্রম করে কুতুবপুর ইউনিয়নের কাঁচাবাড়ীর পূর্বদিকে কুঠিপাড়া ঘাটের কাছে যমুনেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়।

ফলে বদরগঞ্জ উপজেলা সদর বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে। এটি দখলদারদের কাছ থেকে নদী উদ্ধারে এক অন্য রকম দৃষ্টান্ত। বর্তমানে প্রাণ ফিরে পাওয়া মরা তিস্তার দুধারে পাড় সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়নে নদী-তীরবর্তী এলাকায় বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এখন এসব চারা গাছ লিক লিক করে বেড়ে সবুজায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের জন্য ১১.৫৯ একর খাসজমি উদ্ধার করে তা খনন করা হয়েছে।

নদীর বর্তমান উৎপত্তিস্থল নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের বিলাঞ্চলে। সেখান থেকে এটি চার কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর মুচিরহাট এলাকা দিয়ে বদরগঞ্জ উপজেলায় প্রবেশ করে। ঘিরনই নদীটি করতোয়া নামে রংপুর-দিনাজপুর সীমানা বরাবর ৩৬ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে বদরগঞ্জের বকসীগঞ্জ ব্রিজের উজানে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা থেকে প্রবাহিত হয়ে সোনারবান (সোনারবন্ধ) নামে অপর একটি নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই মিলিত প্রবাহ ‘ঘিরনই’ নামে বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণপুর ও লোহানীপাড়া ইউনিয়নের সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নে করতোয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ঘিরনই নদীর দৈর্ঘ্য ৪৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে চলতি বছর (২০২০-২০২১) এই নদীর ৩ দশমিক ২৬৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। ফলে খনন করা অংশের দুপাড়ের চারটি গ্রামের জনগণের দৈনন্দিন গৃহস্থলি কাজে নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, এই নদী খননের কাজ করায় অনেক ভালো হয়েছে। নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক থাকলে এই অঞ্চলের মানুষের অনেক সুবিধা হবে। শাখা নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আসবে এলাকার কৃষিকাজে। বদলে যাবে এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি।

নদী গবেষকদের দাবি, নদী তীরবর্তী কৃষি, প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদী উদ্ধার প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।হারিয়ে যাওয়া নদী উদ্ধারে মরা তিস্তা অনুকরণীয় হতে পারে বলছেন নদী গবেষকরা।

রিভারাইন পিপল বাংলাদেশের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ওই অঞ্চলের কৃষি, জীব বৈচিত্র্য এবং পরিবেশের একটি অভাবনীয় ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। দেশের প্রত্যেক এলাকার নদ-নদীকে বাঁচাতে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। একইসঙ্গে উত্তরের জীবনরেখা তিস্তা নদীকে ঘিরে প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে হবে।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান জানান, দীর্ঘ দিন সংস্কারের অভাবে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। গোচারণভূমি হয়ে গেছে। অনেকেই চাষাবাদ করত। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো, বন্যা হতো, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতো। জলাবদ্ধ থাকা জমিগুলো এখন চাষের উপযোগী হয়ে উঠছে। এখন মরা তিস্তা আবার তার হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে। সেখানে প্রায় ২০টি গ্রামের ৫ হাজার হেক্টর জলাবদ্ধ জমি এখন চাষ উপযোগী হয়েছে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন