• আজ বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২১ অক্টোবর, ২০২১ ৷

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করেই রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ড!

Chattragram news
❏ শুক্রবার, অক্টোবর ১, ২০২১ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা ও আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউমেন রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের চেয়ারম্যান বিশ্বময় পরিচিত রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহ (৫০)। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প-১ এর নিজ অফিসে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

গত বুধবার রাত পৌনে নয়টার দিকে লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প ইস্ট-ওয়েস্ট ১ নম্বর ব্লকে অকস্মাৎ অজ্ঞাতনামাদের উপর্যপূরি গুলিতে নিহত হন তিনি। মুহিবুল্লাহ মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু এলাকার লংডাছড়া গ্রামের মৌলভি ফজল আহমদের ছেলে। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় জানাজা শেষে লম্বাশিয়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

ক্যাম্পের বিতর্কিত কথিত সংগঠন আরসা নেতারাই মাস্টার মুহিবুল্লাহকে হত্যা করেছে বলে দাবি করেছেন নিহতের ছোট ভাই হাবিব উল্লাহ। এ ঘটনার পর থেকে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোরদার করা হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। বাসা থেকে তেমন বাইরে বের হয়নি রোহিঙ্গারা। বৃহস্পতিবার এনজিও কার্যক্রম বন্ধ ছিল ক্যাম্পে।

মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহর দাবি, কুতুপালংয়ের লম্বাশিয়া ক্যাম্পের একটি মসজিদে বুধবার এশার নামাজ শেষ করে দু’ভাই এক সাথে বের হন। এরপর আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) এর অফিসে অবস্থান করে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলছিলেন মুহিবুল্লাহ। এসময় ২০-২৫ জনের একটি বন্দুকধারী দল সেখানে এসে তার ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি করে। ওই অফিসে থাকা অন্যান্যদের মারধর করে ছেড়ে দিলেও ভাইয়ের বুকে গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

হাবিবুল্লাহ আরো বলেন, আমার ভাই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। তিনি রোহিঙ্গাদের সবসময় বলতেন আমাদেরকে (রোহিঙ্গা) আমাদের দেশে (মিয়ানমারে) ফিরে যেতেই হবে। প্রত্যাবাসনে তার দৃঢ়তার জন্য সাধারণ রোহিঙ্গারাও তাকে ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। রোহিঙ্গাদের যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য আমার ভাই এগিয়ে আসতেন। তাদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছিলেন। সাধারণ রোহিঙ্গারা তাকে নেতা হিসেবে গণ্য করতেন ও মানতেন। শুধু ক্যাম্পে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও আমার ভাইয়ের পরিচিতি ছিলো। এটি কথিত সংগঠন ‘আরসা’ ও ‘আল-ইয়াকিন’র নেতারা সহ্য করতে পারতেন না। তারা বলতো, এখানে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আমরাই সিদ্ধান্ত নেব এবং সবকিছু করবো। তুকে কেন নেতা মানা হবে? মানসিক এ দন্ধ থেকেই মুহিবুল্লাহ হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছে ক্যাম্পের ‘আরসা’ নেতা নামে পরিচিত মাস্টার আব্দুর রহিম, মুর্শিদ, লালুসহ ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ। এদের মাঝে কয়েকজন কথিত ‘আল ইয়াকিনের’ সদস্য। নির্মম এ হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে ঘাতকদের শাস্তির দাবি করেছেন হাবিবুল্লাহ।

এদিকে, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ খুনের পর রোহিঙ্গাদের মাঝে অজানা আতংক বিরাজ করছে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ডের বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলতে রাজি হচ্ছে না কোন মাঝি বা নেতা।

তবে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা দাবি করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নেয়ায় মিয়ানমার সরকারের পূর্ব পরিকল্পনা মতে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে হত্যা করেছে। মুহিবুল্লাহর সহযোগী আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা মিয়ানমারের টার্গেটে রয়েছে বলে দাবি করেন এসব রোহিঙ্গা নেতারা।

সচেতন রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, প্রত্যাবাসনের বদলে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে মিয়ানমার সরকার। এজন্য তারা বিপথগামী লোভী রোহিঙ্গাদের দিয়ে ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশ্ব দরবারে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসাবে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলাটি প্রশ্নবিদ্ধ করাই মিয়ানমারের মূল লক্ষ্য বলে দাবি তাদের।

রোহিঙ্গা নেতা হামিদ উল্লাহ বলেন, আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই। তবে মিয়ানমার সরকার একদিকে আমাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে যাতে আর মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে না হয় সেজন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। তার দাবি, ক্যাম্পে এখন যেসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে সবই হচ্ছে মিয়ানমারের ইশারায়। তারা বিপথগামী কিছু রোহিঙ্গাকে ব্যবহার করে কথিত বিতর্কিত সংগঠন আল-ইয়াকিন ও আরসার নাম ভাঙিয়ে ক্যাম্পে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকান্ড এর অংশ বলে দাবি করেন তিনি।

রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, আমরা আমাদের সম্পদকে হারিয়ে পেলেছি। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ কমে গেছে। সবার মাঝে অজানা শংকা কাজ করছে।

রোহিঙ্গাদের আইনশৃঙ্খলা দায়িত্ব থাকা ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক এসপি নাইমুল হক বলেন, ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে, পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আহাম্মদ সঞ্জুর মোরশেদ বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে নিহত মুহিবুল্লাহ’র মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো মামলা হয়নি। কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় জানাজা শেষে লম্বাশিয়া কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন