• আজ বৃহস্পতিবার, ১২ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২৮ অক্টোবর, ২০২১ ৷

ভারতীয় হাতির তাণ্ডবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশী কৃষক

Mymensing news
❏ শুক্রবার, অক্টোবর ৮, ২০২১ ময়মনসিংহ

কামরুজ্জামান মিন্টু, স্টাফ রিপোর্টারঃ ভারতীয় পাহাড়ি হাতির তাণ্ডবে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বছরের পর ধরে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে জমির ফসল, লণ্ডভণ্ড হচ্ছে বাড়িঘর। ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও।

স্থানীয়রা জানান, এ উপজেলায় বাংলাদেশ- ভারত সীমান্তের আড়াই কিলোমিটার অংশে কাটা তারের কোনো বেড়া নেই। এ-সব অংশ দিয়ে ভারতের সীমানা পেড়িয়ে বন্য হাতি খাবারের সন্ধানে অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এ সময় ইচ্ছেমতো ভয়ঙ্কর তাণ্ডব চালিয়ে আবারও ফিরে যায় আপন ঠিকানায়।

এছাড়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এসব হাতির পাল থেকে তাদের সীমান্তবর্তী ফসলের ক্ষয়ক্ষতি রক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে সাহায্য করছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের এদিকের সীমান্ত এলাকায় পাহাড় থেকে শতাধিক কিংবা অর্ধশতাধিক হাতি একসাথে দল বেধে খাবারের সন্ধানে বেড় হয়। তখন ভারতের সীমান্তে ধ্বংসলীলা চলে। ভয় আর আতঙ্কে ভারতে থাকা সীমান্তে বসবাসকারীরা ছুটাছুটি করে। তারা ফসলসহ নিজেদের রক্ষার স্বার্থে হাতিকে তাড়া দেয়। তখনই ‘বিএসএফ’ সীমান্তের গেট খুলে বাংলাদেশে হাতির পাল প্রবেশ করিয়ে দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাতি সবচেয়ে বেশী তাণ্ডব চালায় উপজেলাটির ভুবনকুড়া ইউনিয়নের বানাই চিরিঙ্গাপাড়া, ধোপাঝুড়ি, জখমকুড়া, কোচপাড়া, রঙ্গমপাড়া ও কড়ইতলী এলাকায়। সন্ধ্যার পর থেকে অধিক রাত পর্যন্ত প্রায় নিয়মিত তাণ্ডব চলে।

টর্চলাইট, মশাল জ্বালিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে, পটকা ফুটিয়ে ও লাঠি হাতে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন মানুষ। তবুও থামানো যাচ্ছে না এসব হাতির তাণ্ডব। এতে করে অন্তত ৩২ জন কৃষকের ৫০ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়ে কৃষকরা এখন দিশেহারা।

উপজেলার ভুবনকুড়া ইউনিয়নের বানাই চিরিঙ্গীপাড়া এলাকার কৃষক চাঁন মিয়া বলেন, দিনমজুরের কাজ করে কোনোরকম সংসার চালাই। ত্রিশ শতক জমিতে আমন ধান ছিল। এরমধ্যে দশ শতক জমির চারা চোঁখের সামনে তছনছ করে দিয়েছে হাতির পাল।

তিনি বলেন, সারারাত পাহারা দিয়েও হাতি ফেরাতে পারিনি। হাতির সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর যুদ্ধ করতে চাই না। এখন আমরা ক্লান্ত।

একই এলাকার কৃষক ইব্রাহিম মিয়া বলেন, অর্ধলক্ষ টাকা দেনা করে ৩শ’ শতক জমিতে আমন ধান চাষ করেছি। সম্প্রতি একদল ভারতীয় হাতির পাল রাতের আঁধারে এসে পা দিয়ে পিষ্ট করেছে ধান গাছ। সারাবছর খাবো কি? দেনা পরিশোধ করবো কেমনে? আমি সরকারি সহায়তা চাই।

কড়ইতলি এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, সীমান্তে হাতির সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ দীর্ঘদিনের। তবে, বিগত কয়েক বছর হাতির আক্রমণ কিছুটা কমলেও এক বছর ধরে হাতির তাণ্ডব মাত্রাতিরিক্ত। সকল ধরনের ফসল খেয়ে সাবাড় করার পাশাপাশি পা দিয়ে সব তছনছ করে দিচ্ছে। এরপর বাড়িঘরে হামলা করছে। হাতি তাড়ানোর মতো আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই।আমরা এখন অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছি।

উপজেলার ভূবনকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুরুজ মিয়া জানান, হাতিকে তাড়ানোর জন্য ইউনিয়ন পরিষদের তহবিল থেকে কৃষকদের কেরোসিন, টর্চলাইট ও পটকা সরবরাহ করে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবুও দলবেঁধে হাতি হানা দিচ্ছে। তাই ফেরানো যাচ্ছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, হাতির তাণ্ডবে অন্তত ৪০ একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার তথ্য পেয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষকদের তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত অন্যদের তালিকার কাজ চলমান আছে।

এ বিষয়ে হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল করিম সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ভারতীয় সীমান্তের প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই। এসব অংশ দিয়ে হাতি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এছাড়া হালুয়াঘাটে ভারতের সীমান্তের ভেতর হাতি আক্রমণের সময় বিএসএফ গেট খুলে দেয়। তখন দলবেধে হাতিগুলো অবাধে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

তিনি বলেন, গত এক বছর ভারতীয় হাতির আক্রমণে একজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। এছাড়া এর আগেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। মূলত খাবার খেতেই হাতিগুলো আসে। এসময়ই তাণ্ডব চালানো হয়। হাতি শান্ত হলে বিএসএফ গেট খুলে দেওয়ায় আবারও ভারতে ফিরে যায়।

ইউএনও আরও বলেন, অবস্থা উত্তরণে স্থানীয় যু্বকদের নিয়ে হাতি প্রতিরোধ টিম গঠন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সরকারিভাবে সহযোগিতার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং বনবিভাগকে অবহিত করেছি।

আরও পড়ুন :