• আজ বৃহস্পতিবার, ৫ কার্তিক, ১৪২৮ ৷ ২১ অক্টোবর, ২০২১ ৷

বাংলাদেশে দুর্গা পূজার উৎসব ও সংস্কৃতির সম্প্রীতি


❏ বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৪, ২০২১ মুক্তমত

কামরুল ইসলাম-

সকল ধর্মীয় প্রথার ভেতর আধ্যাত্মিক, সামাজিক জীবন আচার, কৃত্য প্রথা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনবদ্য হয়ে প্রকাশ পায়। নৃ-গবেষণায় দেখা যায়, সমাজে মানুষের সামাজিক বিভাজন বৃত্তিকে সম্পৃক্ত করে অগ্রসর হয়েছে। বাঙালিকে বর্ণভেদে ছত্রিশ জাতে বিভাজন আনুমানিক তের শতকের দিকে সংকলিত বৃহদ্ধর্ম পুরাণে লক্ষ্য করা যায়। প্রাচ্যের মানুষের আত্মপ্রত্যয় ও জীবনের নিরাপত্তা আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যকে উদ্যম আনন্দে বিশ্বাস সংস্কারে জীবন জীবিকায় প্রতিফলন করে। ফলে বহুকাল অববাহিকার আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য সংস্কৃতির বিবর্তনে ‘ মাতৃদেবী’র শক্তিশালী রূপের আবর্তন ঘটে।

আরাধনা, সঙ্গীত, নৃত্যনৈপুণ্যে সংস্কৃতির সম্প্রীতিকে জাগ্রত করে। হেনরি ও লংফেলোর মতো বলতে হয় Music is the universal language of mankind. তাইতো দুর্গা পুজার সময়কালকে শারদীয় উৎসব বলা হয়ে থাকে। শব্দযন্ত্রে সুমধুর সংগীত বাজতে থাকে, সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মান্না দে’সহ সমকালের শিল্পীদের গান। ১৯৪১ সালে কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতায় সুরারোপ করেন সঙ্গীতজ্ঞ গিরীন চক্রবর্তী।

লক্ষ্য করি, পুজা উপলক্ষ্যে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের সুরে হৈমন্তী শুক্লার গান, ওস্তাদ আলী আকবরের সুরে শিল্পী আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া গান, সঙ্গীতজ্ঞ পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২টি গানের কথায় পন্ডিত রবিশঙ্করের সুরারোপ, শিল্পী কিশোর কুমারের গানে শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সুর সহ অসামান্য সংগীতের নিদর্শন মেলে। তখন বলতে ইচ্ছে করে, শিল্পী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গান, স্মৃতির জানালা খুলে চেয়ে থাকি/ চোখ তুলে যতটুকু আলো আসে, সে আলোয় মন ভরে যায়।”

উৎসবের মন্দির তটে, এখনও শুনতে পাই, এলো মা আমার, ঢাক বাজা কাসর বাজা, এলোরে এলো দর্গা মা, আসে মা দুর্গা আসে, দুর্গা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী, অয়ি গিরিনন্দিনী নন্দিতমেদিনি, সবার দুর্গা মা সহ বেচিত্র্যের গান। বাংলাদেশ, ভারত, নেপালে দুর্গা পুজা যেন সংস্কৃতির সম্প্রীতি গড়ে তুলেছে।

বিশ্বব্যাপী করোনা সংকটে বিপর্যস্ত হলেও ধর্মীয় প্রথা উৎসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাংলাদেশে দুর্গাপুজা পালনের প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়। পুজামন্ডপ প্রস্তুতিকালে কুষ্টিয়া, গাজীপুর, গাইবান্ধা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জে বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপ, আশঙ্কামুক্ত করার কঠোর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় বলে মনে হয়েছে। তথাপি দুর্গাপূজার সময়কালে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা কারো কাম্য হতে পারে না। আমরা আশা করব, সরকারের গৃহিত পদক্ষেপে নির্বিঘ্নে শঙ্কামুক্ত হয়ে সকলেই পূজা-উৎসব সম্পন্ন করতে পারবেন।

বাংলাদেশে দুর্গাপূজা সনাতনপন্থীদের বৃহৎ উৎসব আনন্দময় হয়ে উঠেছে। সরকারের সকল পর্যায়ে কঠোর সতর্কতা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দুর্গা পূজার উৎসব তীর্থে সকলে মিলিত হবেন। ধর্মের ভিন্নতা সত্ত্বেও উৎসব সবার, এই ভাবনায় সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহৎ উৎসবে সকলে উপভোগ করবে। বিগত ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বত্রিশ শয়ের অধিক দূর্গামন্ডপ তৈরি হয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ি দেখা যায়, ২০২০ সালে পুজামন্ডপ ছিল ৩০ হাজার ২১৩টি। ২০২১ সালে পুজামন্ডপের সংখ্যা ৩২ হাজার ১১৮ টি। এটি আশাব্যঞ্জক।

২০১৯ সালে বাগেরহাটের শিকদার বাড়িতে সর্ববৃহৎ পূজামন্ডপ তৈরি হয়েছিল। ৮০১ টি মূর্তি দিয়ে সেখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে বহু লোকের আগমন ঘটে ঐ এলাকায়। ২০১০ সালে ২০১ টি মূর্তি দিয়ে বাগেরহাটের খানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গাঁয়ের ব্যবসায়ী লিটন শিকদার ‘ শিকদার বাড়ির পূজা’ হিসেবে দূর্গাপূজা প্রচলন করে। ২০১৯ সালে স্থানীয় মৃৎশিল্পী বিজয় কৃষ্ণ বাচাড় ও ১৫ জন সহ মৃৎশিল্পী নিয়ে ৬ মাস ধরে মূর্তি তৈরি করে।

নোয়াখালি জেলার রামেন্দুসাহার বাড়ির সামনে ৭১ ফুট দেবী দুর্গার প্রতিমা সেরা প্রতিমা খ্যাতি আছে। ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ২০ কি.মি দূরে ধোপাডাঙ্গা গ্রামে ২৫০ প্রতিমা নিয়ে দেবীদুর্গামন্ডপ করেছেন তিনজন মৃৎশিল্পী, প্রলয় বিশ্বাস, শিশির বিশ্বাস, চয়ন বিশ্বাস। এসব পূজার আয়োজন ব্যতিক্রমধর্মী, যা পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বন করে সৃষ্টি করা হয়। সত্য, দ্বাপর, ত্রেতা ও কলি- এই চার কালে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে চার দেবতার আর্বিভাব ঘটে। শ্রীহরি, শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীগৌরাঙ্গের বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ তুলে ধরা হয়েছে।

যশোদা জীবন দেবনাথের বাড়িতে বিশাল দুর্গাপূজা প্রসিদ্ধ। পৌরাণিক দেবী দুর্গা, সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ থেকে দেবীর জন্ম। কথিত আছে, ব্রহ্মার বরে পুরুষের অবধ্য হয় মহিষাসুর এবং স্বর্গ দখল করে নেয়। স্বর্গরাজ্য হারা দেবতারা ভগবান বিষ্ণুর শরনাপন্ন হলে, তাঁর নির্দেশে দেবতার তেজঃপুঞ্জে দেবী দুর্গার আর্বিভাব হয় এবং দানবের নিকট থেকে স্বর্গরাজ্য উদ্ধার করেন।

আরো জানা যায়, দুর্গ বা দুর্গম নামে দানবকে বধ করেন বলে নাম হয়েছে মা দুর্গা। পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে দেবী দুর্গার আর্বিভাব , অসুর দমনে মহাশক্তির প্রয়োগ ঘটে। এজন্য দেবী দুর্গা মমহাশক্তিশালী।

বাংলাদেশের শহরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুর্গাপূজা দ্বিতীয় প্রধান উৎসব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্ব পায়। প্রায় সকল পূজামন্ডপে সরকার থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে সম্রাট আকবরের ( ১৫৫৬-১৬০৫) সময়ে রাজশাহীর রাজা কংস নারায়ণ দুর্গাপূজা প্রচলন করেন। মতান্তরে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের( ১৭১০-১৭৮৩) সময়কালে সূচনা হয় বলে অনেকে মনে করেন। তবে এসব মতের পূর্বের নিদর্শনে দেবীদুর্গাপূজা প্রচলন ছিলো বলে জানা যায়। জীমূতবাহনের( আনু:১০৫০-১১৫০) দুর্গোৎসবনির্ণয়, বিদ্যাপতির ( ১৩৭৪-১৪৫৬) দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী, শূলপাণির (১৩৭৫-১৪৫৬) দুর্গোৎসব বিবেক, কৃত্তিবাস ওঝার ( ১৪২৫-১৪৮০) ক্রিয়াচিন্তামণি, ইত্যাদি নিদর্শনে দুর্গাপূজা প্রচলিত ছিল।

কলকাতার চিৎপুরে চিত্তেশ্বরী দুর্গার বিগ্রহ ১৫৮৬ সালে মুর্শিদাবাদের জমিদার স্থাপন করেন। তবে ইংরেজ আগমনের পর দুর্গাপূজা উৎসবে পরিণত হয়। পাথুরিয়াঘাটের ঘোষবংশের শ্রীরামলোচন ঘোষ ১৭২৭ সালে সূচনা করেন। ১৭৫৭ সালের পর শোভাবাজারের রাজবাড়িতে মহারাজা নবকৃষ্ণদেব ধুমধাম করে যে দুর্গাপূজা সূচনা করেন, সেই অনুষ্ঠানে লর্ড ক্লাইভসহ বহু ইংরেজ, স্থানীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যোগ দিতেন।

বিশেষ করে ১৭৬০ সালে নবকৃষ্ণদেবের দুর্গোৎসব মহাউৎসবে পরিণত হয়। পূজার অঙ্গনে নৃত্যগীত, বাঈনাচ, যাত্রা ইত্যাদি অনুষ্ঠান বিশালরূপ ধারণ করে। খাওয়া দাওয়াও ছিল উৎসবের সাথে সংশ্লিষ্ট। ইংরেজ শাসকরা যোগ দিতেন অনুষ্ঠানে, যার ফলে দুর্গা উৎসব পর্যায়ক্রমে সকলের উৎসবে পরিগণিত হতে থাকে। এই উৎসবে মুসলিম বাঈরা আমন্ত্রিত হতো।

এতটাই ব্যাপক ছিল, তা নিয়ে কটাক্ষ করে দীনেন্দ্রকুমার রায় তাঁর ‘পল্লীচিত্র’ এবং ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ কলিকাতা কমলালয়’ লেখেন। ভবানীচরণ লেখেন, কলকাতার দুর্গোৎসব দেবার্চনা না বলে, ঝাড় উৎসব, বাতি উৎসব, কবি উৎসব, বাঈ উৎসব, কিংবা স্ত্রীর গহনা উৎসব ও বস্ত্রোৎসব বলিলেও বলা যায়।’ এইসব যা কিছু ঘটুক না কেন, ১৮২০ সাল পর্যন্ত বাংলার বিভিন্ন জেলা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাপক আকার ধারণ করে।

দুর্গাপূজার উৎসবে বহু লোকের সমাগম অব্যাহতভাবে চলমান হয়ে সমকাল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কবিগুরু ধর্মকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সেখানেই আমাদের বৃহৎ উপলব্ধি সৃষ্টি করে। ‘ ‘উৎসবের দিন আমরা যে সত্যের নামে বহুতর লোকে সম্মিলিত হই, তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম।উৎসবে পরস্পরকে পরস্পরের কোন প্রয়োজন নাই– সকল প্রয়োজনের অধিক যাহা, উৎসব তাহা লইয়া। এইজন্য উৎসবের একটা প্রধান লক্ষণ প্রাচুর্য। এইজন্য উৎসবদিনে আমরা প্রতিদিনের কার্পণ্য পরিহার করি। প্রতিদিন যেরূপ প্রয়োজন হিসাব করিয়া চলি, আজ তাহা অকাতরে জলাঞ্জলি দিতে হয়। দৈন্যের দিন অনেক আছে, আজ ঐশ্বর্যের দিন।….

‘তাই উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুলপাতার দ্বারা সাজাই, দ্বীপমালার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সংগীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি।

এইরূপ মিলনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎবের দিনকে বৎসরের সাধারণ দিনগুলির মুকুটমণিস্বরূপ করিয়া তুলি। যিনি আনন্দের প্রাচুর্যে, ঐশ্বর্যে, সৌন্দর্যে বিশ্বজগতের মধ্যে অমৃতরূপে প্রকাশমান–আনন্দরূপমমৃতং যদাবিভাতি– উৎসবের দিন তাঁহারই উপলব্ধি দ্বারা পূর্ণ হইয়া আমাদের মনুষ্যত্ব আপন ক্ষণিক অবস্থাগত সমস্ত দৈন্য দূর করিবে এবং অন্তরাত্মার চিরন্তন ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য প্রেমের আনন্দে অনুভব ও বিকাশ করিতে থাকিবে।’ (উৎসব, ধর্ম- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

কাল পরিক্রমায় মাতৃরূপে শক্তিতে আর্বিভূত দুর্গাপূজা উৎসব অনন্ত সৌন্দর্য ঐশ্বর্যে সকলের অন্তরলোককে আলোকিত করছে। বিশ্বব্যাপী যে অস্থির, চরম পরিস্থিতি বিরাজমান, তা থেকে মানবমনের অসুরশক্তির বিনাশে উৎসব কার্যকর হবে বলে বিশ্বাস করি। ব্যক্তি, সমাজবদ্ধ মানুষ, রাষ্ট্র কাঠামোর শাসকদের মানবিক শান্তির গুণাবলি সত্যরূপে জাগ্রত হোক।

দূর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের, কিন্তু উৎসব সকলের। এ এক সত্যের জ্যোতি, অনন্ত ঐশ্বর্য। চারপাশের সকলের ভেতর শান্তি সম্প্রীতি বিরাজ করার মহিমায় দুর্গাপূজা ও উৎসব আনন্দময় হোক।

দুর্গাপূজায় হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান সম্প্রদায় সহ সকল ধর্মের মানুষের সম্প্রীতি অটুট হবে বলে বিশ্বাস করি। অতি মহামারীর কবল থেকে বিশ্ব মুক্তি পাক, এটাই হোক প্রার্থনা।

বহুবিধ কারণে দুর্গা পুজার আবেদন ধর্মীয়কে আবর্তন করে সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে সম্প্রীতির জয়গানে নিবেদিত হয়ে যায়। এই সংস্কৃতি শুধুমাত্র সর্বভারতীয় নয়, তা অসীমান্তিক বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতির সাথে সগৌরবে ও সগর্বে উচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে দুর্গা পুজা, শারদীয় উৎসব বিশ্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সকল মানুষের কল্যাণ সূচিত হোক। বিশ্বশান্তির জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনে দুর্গা পুজা উৎসব অনন্য মহিমা প্রদান করে ঐক্য ও শান্তির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

লেখক-

কামরুল ইসলাম, কবি, প্রাবন্ধিক
সাধারণ সম্পাদক
বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন