• আজ বুধবার, ২৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ৷

উত্তাল নদী মৃত, দখল-দুষণ মুক্ত করতে বাঁধা কোথায়?

Mymensing news
❏ শনিবার, অক্টোবর ১৬, ২০২১ ময়মনসিংহ

কামরুজ্জামান মিন্টু, স্টাফ রিপোর্টার: ময়মনসিংহের ভালুকার খীরু নদীতে একসময়ের স্বচ্ছ পানির ঢেউ থাকলেও বর্তমানে বিষের নহরে পরিণত হয়েছে। শিল্পকারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্যে নদীটির দিকে তাকানোর জো নেই। এছাড়া প্রভাবশালীদের দখলে নদীটি এখন ডোবায় পরিণত হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে নদীটি দ্রুত খননের দাবী স্থানীয়দের।

স্থানীয়রা জানান, নদীটির বুক চিরে চলাচল করতো লঞ্চ ও পালতুলা নৌকা। স্বচ্ছ টলমলে পানিতে পাওয়া যেতো বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এলাকার কৃষি কাজে ব্যাবহৃত হতো পানি। নদীর দু’পাশের স্থানীয়রা গোসল করতো। বর্তমানে সেই পানি আলকাতরার রং ধারণ করে প্রচন্ড দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খননের উদ্যোগ না নেওয়ায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে এই নদী।

উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের পাড়াগাঁও গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন বলেন, আগে এই নদীর পানি ব্যবহার করে জমি চাষাবাদ করেছি। মাঝেমধ্যেই সাতার কেটে গোসল করেছি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নদীর দৃশ্যপট পাল্টে পানি কালো কিচকিচে রং ধারণ করেছে। এখন এই পানি কোনো ফসলেই ব্যবহার করা হয়না। মারাত্মক বিষাক্ত পানি। পানিতে স্পর্শ করলে চুলকানি সৃষ্টি হয়।

একই গ্রামের আফাজ উদ্দিন নামে একজন ব্যবসায়ী বলেন, মাটি ভরাট করে প্রভাবশালীদের দখলবাজীর কারণে নদীটি ছোট্ট নালায় পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের নিরব ভূমিকায় শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য অবাধে নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে। ফলে কোনো ধরনের মাছ নদীতে নেই। ধীরে ধীরে নিঃশেষ হচ্ছে একসময় উত্তাল ঢেউ থাকা নদীটি৷

নদীর এমন বেহাল অবস্থায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলন ময়মনসিংহের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে ভালুকায় গড়ে উঠা শিল্প কারখানাগুলোর বর্জ্যে দুষিত হয়েছে খীরু নদী। নদীটিকে দখল ও দুষণের কবল থেকে রক্ষা করতে প্রশাসনকে বারবার বলেছি। অথচ অজানা কারনে প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছে।

তিনি বলেন, এখন বৃহৎ আন্দোলন ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। খুব দ্রুত নদীটিকে দখল ও দুষণের কবল থেকে মুক্ত করা না হলে স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জেসমিন জাহান বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানিতে অ্যালুমিনিয়াম বেশি থাকে। এছাড়া কেমিক্যাল ও ধাতব পদার্থ থাকে। ফলে, এ পানি কৃষি জমিতে ব্যবহার করা যাবেনা। যদি ব্যবহার করা হয়, তাহলে পাতা মরে ফলন নষ্ট হবে।’

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল বাকিউল বারী সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, নদীটির দৈর্ঘ্য ৪৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর সীমান্ত থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার জুড়ে ভালুকার উপর দিয়ে বয়ে গেছে এ নদী। দীর্ঘ বছরে নদীটি দখল ও দুষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

তিনি বলেন, দখল হওয়া জায়গাগুলো চিন্হিত করার চেষ্টা চলছে। খুব দ্রুত দখলকারীদের তালিকা করে উচ্ছেদ করতে অভিযান চালানো হবে। বর্জ্য ফেলে পরিবেশ নষ্ট কারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালমা আক্তার সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, চলতি বছরের ১২ জুন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম খীরু নদী পরিদর্শন করেছেন। নদীটি খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি দ্রুত খনন কাজ শুরু হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ফরিদ আহমেদ সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ভালুকা উপজেলায় তিন শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সবগুলোতেই বজ্র শোধনাগার রয়েছে। তবে অনেকগুলোর মান ভালোনা। ভালোভাবে বর্জ্য শোধন করা হচ্ছে না। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠান খীরু নদীর পানিতে বর্জ্য ফেলে দুষিত করছে।

তিনি বলেন, আমরা মাঝেমধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানকে মোটা অংকের জরিমানা করেছি। সম্প্রতি টাইটেল বাংলা, মাহদী ও আকিজ গ্রুপসহ ৭টি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ১ কোটি টাকার বেশী জরিমানা করা হয়েছে। নদীটিকে রক্ষার স্বার্থে সবগুলো শিল্প প্রতিষ্ঠানে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও বর্জ্য শোধনাগার না থাকলে কিংবা সঠিকভাবে বর্জ্য শোধন না করলে জরিমানার পাশাপাশি অধিদপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।