• আজ সোমবার, ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ৷

গবেষকদের প্রচেষ্টায় কৃষিতে বিপ্লব

Mymensing news
❏ বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৮, ২০২১ ফিচার

কামরুজ্জামান মিন্টু, স্টাফ রিপোর্টারঃ বাংলাদেশ এখন দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশে এখন উৎপাদিত হয় উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য। দেশে এই খাদ্যবিপ্লবের পেছনের কারিগর কৃষিবিদরা। দীর্ঘদিনের গবেষণায় তারা উদ্ভাবন করেছেন উন্নত জাতের ধান, সবজিসহ নানা কৃষিজাত ফসল। তাদের উদ্ভাবনে কৃষকরা যেমন লাভবান হয়েছেন, দেশের দৈনন্দিন পুষ্টি চাহিদা পূরণে তা রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

এমন অবস্থায় সোমবার উদযাপিত হচ্ছে জাতীয় কৃষি দিবস। ২০০৮ সাল থেকে ১৫ নভেম্বর দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।

দেশে খাদ্য উৎপাদনে অভাবিত সাফল্যের পথে শুধু খাদ্যশস্যই নয়, বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছও এসেছে খাবারের প্লেটে। প্রতিনিয়ত আরও গবেষণা করছেন কৃষিবিদরা। আনছেন দ্রুত উৎপাদনশীল নানা ফসল ও মাছ।

নতুন জাত উদ্ভাবনে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা ধানের উচ্চ ফলনশীল বেশ কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি জাত চাষ হচ্ছে সারা দেশে।

গবেষকদের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল আউশ ধানের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরাটম-২৪, বিনাধান-১৪, বিনাধান-১৯ ও বিনাধান-২১।

আমন ধানের জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বিনাধান-৭, বিনাধান-১১, বিনাধান-১২, বিনাধান-১৩, বিনাধান-১৫, বিনাধান-১৬, বিনাধান-১৭, বিনাধান- ২০ ও বিনাধান-২২। বোরোর জাত ইরাটম-২৪, বিনাধান-৫, বিনাধান-৮, বিনাধান-১০, বিনাধান-১৪ ও বিনাধান-১৮।

বিনাগম-১ নামে উচ্চ ফলনশীল একটি গমের জাতও উদ্ভাবন করেছেন গবেষকরা। এটি দেশে গম উৎপাদনে এনেছে সাফল্য।শুধু ধান ও গম নয়, অন্য ফসলের বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনেও সাফল্য দেখিয়েছেন দেশের কৃষিবিদরা। দেশের গবেষকদের উদ্ভাবিত ফসলের মধ্যে রয়েছে ডালজাতীয় ফসল মসুর, ছোলা ও মুগের একাধিক নতুন জাত। উদ্ভাবিত তৈলবীজের মধ্যে রয়েছে চিনাবাদাম-৪, চিনাবাদাম-৬, চিনাবাদাম-৭, চিনাবাদাম-৮ ও চিনাবাদাম-৯। বিনাসরিষা-৪, বিনাসরিষা-৭, বিনাসারিষা-৮, বিনাসরিষা-৯ ও বিনাসরিষা-১০। বিনাতিল-১, বিনাতিল-২, বিনাতিল-৩ ও বিনাতিল-৪ নামে উদ্ভাবিত তিলের জাতগুলো কম চাষ হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহী করতে চেষ্টা করছেন গবেষকরা।

এ ছাড়া উন্নত জাতের মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে রয়েছে বিনাপেঁয়াজ-১ ও বিনাপেঁয়াজ-২, বিনারসুন-১, বিনামরিচ-১ ও বিনাহলুদ-১।

সবজির মধ্যে রয়েছে বিনাটম্যাটো-৬, বিনাটম্যাটো-৭, বিনাটম্যাটো-৮, বিনাটম্যাটো-৯, বিনাটম্যাটো-১০, বিনাটম্যাটো-১১, বিনাটম্যাটো-১২ ও বিনাটম্যাটো-১৩। বিনাপাটশাক-১ নামের জাতটিও সারা দেশে ব্যাপকহারে চাষ হচ্ছে।

ফলের মধ্যে বিনালেবু-১ নামে জাতটি সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। ময়মনসিংহে এখন ব্যাপক হারে এটি রোপণ করছেন চাষিরা।

খাদ্যশস্যের পাশাপাশি মাছ উৎপাদনেও বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছেন বিজ্ঞানিরা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা দেশে বিলুপ্তপ্রায় ৩১ প্রজাতির দেশীয় মাছ চাষযোগ্য করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছ সারা দেশে চাষ হচ্ছে। এতে দেশীয় মাছ উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন চাষিরা।

দেশে ২০০৮-২০০৯ সালে চাষের মাধ্যমে দেশি মাছের উৎপাদন ছিল যেখানে ছিল ৬৭ হাজার টন, ২০১৯-২০২০ সালে তা প্রায় চার গুণ বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টন। বাজারে এখন দেশি মাছের ছড়াছড়ি।

গবেষণায় উৎপাদিত মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, শিং, মাগুর, গুজি আইড়, চিতল, ফলি, মহাশোল, বৈরালী, রাজপুঁটি, মেনি, বালাচাটা, গুতুম, কুঁচিয়া, ভাগনা, খলিশা, বাটা, দেশি সরপুঁটি, কালবাউশ, কই, গজার, গনিয়া, পিয়ালি, ঢেলা, রানি, বাতাসি ও কাকিলা। এ ছাড়া বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা বাকি মাছগুলো নিয়েও গবেষণা চলছে।

বিএফআরআই মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘সারা দেশে যত ছোট মাছ আছে, সেগুলো সংগ্রহ করে লাইভ জিন ব্যাংকে রাখা হচ্ছে। যদি প্রকৃতি থেকে কোনো মাছ হারিয়ে যায়, তাহলে সংরক্ষণে থাকা মাছটি গবেষণা করে ফের সেই মাছের পোনা উৎপাদন করা হবে।’

তিনি জানান, বর্তমানে ময়মনসিংহ স্বাদুপানি কেন্দ্র ছাড়াও বগুড়ার সান্তাহার, নীলফামারী, সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে গবেষণা চলছে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্যে ২০২০ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একুশে পদকও পেয়েছে।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম সময়ের কন্ঠস্বরকে জানান, গবেষকদের উদ্ভাবিত উন্নত জাতের বেশির ভাগ ফসল চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। কারণ এসব জাত চাষে খরচ যেমন কম, উৎপাদনও বেশি হয়।

এ ছাড়া কিছু জাত চাষাবাদের আওতায় আনতে বিনা মূল্যে বীজ বিতরণসহ কৃষকদের নানাভাবে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। নতুন নতুন আরও উন্নত জাত উদ্ভাবনেও গবেষণা চলছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুৎফল হাসান বলেন, ‘গবেষকদের ক্লান্তিহীন গবেষণার কারণেই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে বেশি ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে।

আমাদের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে গিয়ে কৃষি ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।