🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ মঙ্গলবার, ১৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ ৷ ৩০ নভেম্বর, ২০২১ ৷

যেভাবে কাজ করবে ২৩ জেলায় বজ্রপাত নিরোধক কংক্রিটের বিশেষ ছাউনি

বজ্রপাত নিরোধক কংক্রিটের বিশেষ ছাউনি
❏ শুক্রবার, নভেম্বর ১৯, ২০২১ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর ডেস্ক, ঢাকাঃ বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে ‘লাইটার অ্যারেস্টার’ সংবলিত বজ্রপাত-নিরোধক কংক্রিটের ছাউনি (শেল্টার) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

দেশের হাওড়াঞ্চলসহ বজ্রপাতপ্রবণ ২৩ জেলায় এসব ছাউনি নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোঃ এনামুর রহমান।

প্রতিমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ঢাকায় আইইবি ভবনে আয়োজিত ÔCauses of Lightning & Thunder : Safety Issues and Damage MinimizationÕ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।

আইইবি’র যন্ত্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আব্দুস সবুর, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইঞ্জিনিয়ার ইয়াসির আরাফাত এবং আইইবি’র যন্ত্রকৌশল বিভাগের ভাইস চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আহসান বিন বাসার।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিকভাবে হাওড় এলাকায় ১ কিলোমিটার পরপর ১ হাজার বজ্রপাত-নিরোধক কংক্রিটের ছাউনি নির্মাণ করা হবে। এক কিলোমিটার অন্তর অন্তর নির্মাণ করা হবে একেকটি শেল্টার, যাতে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ পেলেই মাঠের কৃষকসহ মানুষজন শেল্টারে আশ্রয় নিতে পারেন।

প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা কমে আসবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, বজ্রপাত ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে এতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর একটি হলো আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম। দ্বিতীয়ত হলো, বজ্রপাত-নিরোধক কংক্রিটের শেল্টার নির্মাণ এবং তৃতীয়ত জনসচেতনতা বাড়ানো।

ডা. মোঃ এনামুর রহমান বলেন, বজ্রপাত-প্রবণ এলাকায় ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ মেশিন বসানো হবে। প্রাথমিকভাবে ৭২৩টি যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বজ্রপাতের ৪০ মিনিট আগেই সংকেত দেবে যন্ত্রটি। ফলে মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারবে।

এতে মৃত্যুর হার কমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যারা খোলা মাঠে কাজ করেন বা মাছ ধরেন, তারাই বজ্রপাতে বেশি মৃত্যুবরণ করেন। তাদের জন্যই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, ইতপুর্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিলেন, দেশের হাওরাঞ্চলসহ বজ্রপাতপ্রবণ ২৩ জেলায় এসব ছাউনি নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা । প্রতিটি ছাউনির সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে ২০১১ সালে মারা গেছেন ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ২০১ জন, ২০১৩ সালে ১৮৫ জন, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ১৬০ জন, ২০১৬ সালে ২০৫ জন, ২০১৭ সালে ৩০১ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ১৯৮ জন, ২০২০ সালে ২১১ জন এবং ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ১০৯ জন।

যদিও বেসরকারি হিসাবে এই সাড়ে আট মাসে মারা গেছেন দুইশর বেশি মানুষ।

পরিসংখ্যান বলছে, বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে দুই শতাধিক মানুষ মারা যান। এর মধ্যে ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি ৩৫৯ জন মারা গেছেন। এর ৭৫ শতাংশই কৃষক। গবেষকরা বলছেন, নাসার তথ্য অনুযায়ী বজ্রপাতের অন্যতম হটস্পট বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হাওরাঞ্চলের পাশাপাশি যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছেন, সেসব এলাকায় ছাউনি নির্মাণে প্রাধান্য দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় হাওরাঞ্চল নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটে। মৌসুমে বজ্রপাত বেশি হয় সুনামগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, বরিশাল এবং উত্তরবঙ্গের রংপুর, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামে।

অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। সাতক্ষীরা, খুলনা, পটুয়াখালী এসব অঞ্চলে বেশি হয় শীতকালে। বজ্রপাত কিংবা বজ্রঝড়ের স্থায়িত্ব সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট। তাই ছাউনি নির্মাণ করে মানুষের প্রাণহানি কমানো সম্ভব। অর্থাৎ কংক্রিটের ছাউনি তৈরি করা হবে।

ঝড় শুরু হলে পশু নিয়ে কৃষকেরা সে ছাউনিতে আশ্রয় নেবেন। ঝড় থেমে গেলে মাঠে ফিরে যাবেন। এমন পরিকল্পনা থাকছে প্রকল্পে। ছাউনি নির্মাণের পাশাপাশি বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করারও চিন্তা করা হচ্ছে।

দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় অ্যারেস্টার বসানো হবে। এ যন্ত্র বজ্রপাত শোষণ করে নেবে। স্পেনের এ প্রযুক্তি বজ্রপাতের ৪০ মিনিট আগেই পূর্বাভাসও দিতে পারে। এটি স্থাপন করা গেলে এতে মৃত্যুর হার কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘বাংলাদেশসহ আমাদের উপমহাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার দিন দিনই বাড়ছে। এ রকম একটি প্রকল্পের কথা আমিও শুনেছি।

যেহেতু বজ্রপাতের সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় হয়নি তাই আমি মনে করি প্রথমে পাইলট প্রকল্প হিসাবে সফল হলে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প বাস্তবায়নে যাওয়া উচিত। আশা করি সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে।’