• আজ সোমবার, ১০ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ২৪ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

বিকৃতমনা মাদ্রাসা শিক্ষকের লালসার শিকার অসহায় এক কিশোরের জবানবন্দী!

মাদ্রাসা শিক্ষকের
❏ বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১ আলোচিত বাংলাদেশ

রবিউল ইসলাম, সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকাঃ নিজের গ্রামের স্কুলেই প্রাইমারীর পাঠ কেটেছে কিশোরের। পরিবারের অবস্থা মোটামুটি স্বচ্ছল। কিন্তু মায়ের ইচ্ছে, ছেলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।

পবিত্র কোরআন শরীফের হাফেজ তৈরি করানোর  ইচ্ছে নিয়ে কিশোর সন্তানকে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে নোয়াখালী থেকে রাজধানী ঢাকায় এনে ভর্তি করিয়ে দেন  একটি স্বনামধন্য হাফিজিয়া মাদ্রাসায়।

শুরুর দিকে ভালোই চলছিলো সবকিছু। কিন্তু বিপত্তি ঘটে চলতি বছরে ঈদুল আযহার ছুটির পরে। অপ্রত্যাশিতভাবে বিকৃত মানসিকতার এক মাদ্রাসা শিক্ষকের দ্বারা ক্রমাগত নিপীড়নের শিকার হয় কিশোর।

বয়ঃসন্ধিকালের এমন সময়ে ঘটনার আকস্মিকতায় মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়ে কিশোর। লজ্জায়, সংকোচে এবং ভয়ে কাউকে কিছুই জানাতে পারেনা সে। উপরন্তু ছিলো শিক্ষকের নানা কায়দায় দেয়া হুমকি!

এবার কোনভাবে শরীর খারাপের কথা বলে মাদ্রাসা থেকে ছুটি নিয়ে নিজের গ্রামের বাসায় ফেরে কিশোর। বাসায় ফেরার পরেও এমন ঘটনাকে ‘নিজের লজ্জা’ ভেবেই কাউকে জানায়নি সে । সারাক্ষন শুধুই অন্যমনস্ক হয়ে থাকতো।

কিন্তু দিনকতক পরেই বাসা থেকে মাদ্রাসায় ফিরে যাবার জন্য চাপ দিতে থাকে কিশোরের মা। কিশোরের মানসিক অবস্থা বোঝার সক্ষমতা হয়তো ছিলো না তার পরিবারের।

একপর্যায়ে জোর করেই মাদ্রাসায় পাঠানোর চেষ্টা করা হলে বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের মামার বাড়িতে পালিয়ে আশ্রয় নেয় কিশোর।

কিন্তু সেখান থেকেও বুঝিয়ে অনেকটা জোর করেই ফের ঢাকায় মাদ্রাসায় দিয়ে যাওয়া হয় কিশোরকে।

দীর্ঘদিন পরে মাদ্রাসায় ফিরে আসে কিশোর। মাদ্রাসা চলাকালীন সময়ে ভয়ে সিটিয়ে থাকতো।
এদিকে যেন এই ফিরে আসার অপেক্ষাতেই ছিলেন সেই বিকৃতমনা শিক্ষক। দু-একদিন থেমেছিলো তার উপর বিকৃত নির্যাতন।

তবে,  ভয়াবহ সেই দুঃস্মৃতির ধকল কাটতে না কাটতেই সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর ভোর বেলায় ফের ঐ শিক্ষকের বিকৃত লালসার শিকার হয় কিশোর! এবারেও কাউকে না জানানোর কড়া হুমকি শিক্ষকের।

সকাল হতেই অসুস্থ্য শরীর আর মাথায় ভয় চেপে এক কাপড়েই  মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে নিজের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে কোনমতে ফিরে আসে কিশোর।

বাসায় ফেরার পরে ঘটনার আকস্মিকতায় বাকরুদ্ধ কিশোরের কান্না থামছিলোনা কিছুতেই।  মা, তার সন্তানের  এমন মানসিক অবস্থা দেখে বুঝতে চেষ্টা করেন এর পেছনের রহস্য। ছেলেকে নানাভাবে অভয় দিয়ে জানতে চাইলে ছেলে তার মাকে খুলে বলে তার সাথে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় সব ঘটনার কথা।

এরপরই নির্লজ্ব আরেক ঘটনার স্বাক্ষী হয়ে বেরিয়ে আসে মাদ্রাসা শিক্ষকের বিকৃত যৌন লিপ্সার ইতিহাস।

দীর্ঘদিন ধরে ১৫ বছর বয়সী কিশোরকে (নাম প্রকাশ করা হলোনা) বলাৎকারের অভিযোগে রাজধানীর মগবাজারের গ্রিনওয়ে দারুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মশিউর রহমানকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রাতেই রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক মশিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে সোমবার রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন ঘটনার শিকার সেই মাদ্রাসাছাত্রের মা।

এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রশিদ মঙ্গলবার বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সত্যতা পাওয়া যায়। পরে মেডিকেল রিপোর্টেও বলাৎকারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আসামির রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত, মামলার নথি ও বিবাদী পক্ষের অভিযোগের সুত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পর পর ভুক্তভোগী ছাত্রকে শিক্ষক মশিউর রহমান মাদ্রাসার দ্বিতীয় তলায় নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে যান। পরে আসামি শরীর ব্যাথার অজুহাতে ভিকটিমকে দিয়ে শরীর ম্যাসাজ করান। এভাবে আসামি দিনে পাঁচ-ছয়বারও ভুক্তভোগীকে ম্যাসাজ করাতেন এবং শেষে যৌন নিপীড়ন করতেন। একইসাথে কাউকে না বলার কথা বলে কৌশলে হুমকি দেন। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে কিশোর ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারেনি।

সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৮টায় কিশোরকে যৌন নিপীড়ন করা হয় বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কাউকে কিছু না বলার জন্য আসামি ছাত্রকে প্রতিবারই ১০০ টাকা করে দিতেন কিছু কিনে খাওয়ার জন্য। এ সময় কিশোরের শরীরে প্রচণ্ড ব্যাথা হলে সে ওষুধও কিনে খায়। কিছুদিন পর সে বাড়িতে চলে যায়।

এরপর কিশোর আর মাদ্রাসায় যেতে আগ্রহ বোধ করেনি বলে মামলায় অভিযোগ করেন তার মা। তিনি আরও বলেন, কেন সে মাদ্রাসায় যেতে চায় না এটা জানতে চাইলে সে আমাকে কিছু জানায়নি পরে অনেক চেষ্টায় সে তার মামাকে ঘটনা খুলে বলে। এবং আবার তার ওপর নিপীড়িন চালানো হতে পারে বলেও ভয় পায়। তখনি মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ঘটনার শিকার কিশোরের বাড়ি নোয়াখালীতে। তার মামা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘গত কয়েক বছর যাবত আমার ভাগনে ওই মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগে পড়ে। কিন্তু বাড়ি আসার পর সে আর মাদ্রাসায় যেতে চাইছিলোনা। এরপর তার মা জোর করলে সে পালিয়ে গ্রামে আমার বাড়িতে চলে আসে।’

কিশোরের মামা আরও বলেন, ‘আমি বুঝিয়ে-শুনিয়ে আবার ঢাকায় মাদ্রাসায় পাঠালে সে বাড়ি ফিরে আসে এবং মায়ের কাছে ওই শিক্ষকের হাতে বলাৎকারের বিষয়টি জানায়। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’