• আজ সোমবার, ১০ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ২৪ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

ফিরে দেখা, ১৯৭১- ‘মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে’

‘মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে’
❏ বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২, ২০২১ ইতিহাস-ঐতিহ্য, ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা- ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বীর বাঙালি বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল ১৬ ডিসেম্বর।

জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভ। স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ে মাসটি মহা আনন্দের, মহা গৌরবের। স্বজন হারানোর বেদনায় এই মাস একইসঙ্গে শোকের, আবার উদযাপনেরও।

দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা এই অবিস্মরণীয় গৌরবদীপ্ত বিজয় অর্জন করেছি। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এই মাসেই বিশ্বের মানচিত্রে সার্বভৌম-স্বাধীন দেশ হিসেবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ।

যুদ্ধকালীন সময়ের দিনপঞ্জি গর্বের সাথে স্মরণ করতে সময়ের কণ্ঠস্বরের পাঠকদের জন্য নিয়মিত আয়োজন ‘মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে’।

আজ ২ ডিসেম্বর ২০২১।

বিজয়ের মাসের দ্বিতীয় দিন। একাত্তরে ডিসেম্বর মাসের সূচনা হয় মুক্তির বারতা নিয়ে। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় এলেও এর অনেক আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকা হানাদারমুক্ত হতে শুরু করে। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মুক্তাঞ্চলের প্রসারতা।

একাত্তরের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- রংপুর, কুমিল্লা, দিনাজপুর, বগুড়া, কুষ্টিয়া, সিলেট, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। অক্টোবর কিংবা তার আগে গ্রাম কিংবা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত শত্রুমুক্ত হলেও নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসে মুক্তির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে অনেক থানা কিংবা কোনো কোনো জেলার অধিকাংশ এলাকায়।

আসন্ন পরাজয় ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠে পাকিস্তানি বাহিনী। এ সময় দেশজুড়ে শুরু হয় গণপ্রতিরোধ। এর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনী যুক্ত হলে যুদ্ধের তীব্রতা ও ভয়াবহতা দুটোই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।

১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বরে ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকায় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অগ্রযাত্রার কথা উঠে আসে। ডিসেম্বরের শুরুর দু’দিনে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধারা বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। এতে রামপুরা ও মালিবাগে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। ধ্বংস হয় দুটি পেট্রোল পাম্প যা হানাদারদের জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম উৎস ছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধার তীব্র আক্রমণে পরাজয় বরণ করে দিনাজপুর শহর থেকে পালিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। অন্যদিকে একই দিনে পঞ্চগড় মুক্ত করে যৌথবাহিনী। এরপর সম্মিলিত বাহিনী এগিয়ে যায় ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে। এরইমধ্যে দেশের সীমান্তবর্তী অন্যান্য অঞ্চলে পাকবাহিনীর অবস্থানের ওপর গোলাবর্ষণ বাড়ানো হয়।

এ সময়ে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামের পথে পথে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান এবং আনোয়ারায় পাক বাহিনীর ওপর মরণপণ ঝাঁপিয়ে পড়েন সূর্য সন্তানেরা। অধিকাংশ স্থানই দখলমুক্ত সক্ষম হন তারা। একাত্তরের এই দিনে তীব্র সম্মুখযুদ্ধ হয় আখাউড়া রেল স্টেশনের দখল নিয়ে। এতে মুক্তিবাহিনী বিজয় লাভ করে।

একই দিনে নরসিংদীর ঘোড়াশালে মুক্তিবাহিনী একটি পাকিস্তানি ক্যাম্পের চারদিক থেকে আক্রমণ করে ২৭ জন হানাদারকে হত্যা করে। সেখান থেকে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার নিয়ন্ত্রণে নেন তারা।

এছাড়া নেত্রকোণার বিরিশিরির বিজয়পুর এলাকায় পাক সেনাক্যাম্পে গেরিলা হামলা চালিয়ে পাঁচ সেনাকে হত্যা এবং ও ২১ রাজাকারকে বন্দী করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

এমন পরিস্থিতিতে মুক্তি বাহিনীসহ যৌথবাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখে দিতে পাক বাহিনী আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে সাধারণ জনগণের ওপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় তারা। বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ, নির্বিচার গুলিবর্ষণে হত্যা, বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি ভীষণভাবে বৃদ্ধি করে হানাদারেরা।

একাত্তরের এই দিনে ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী।

অন্যদিকে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের এক কর্মীসভায় বলেছিলেন, সময় বদলেছে, তিন-চার হাজার মাইল দূর থেকে বর্ণের প্রাধান্য দিয়ে তাদের (পাকিস্তান) ইচ্ছে মতো হুকুমনামা জানাবেন, তা মেনে নেওয়া যায় না।

তিনি আরও বলেন, যদি পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায় তবে বাংলাদেশিরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

ডিসেম্বরের এ সময়টাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার হতে শুরু করে।

তথ্যসুত্রঃ মুক্তিযোদ্ধা একাডেমি ট্রাস্ট।