• আজ সোমবার, ৩ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ১৭ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

অবশেষে হাঁসি ফুটলো ‘ভূমিহীন’ আসপিয়ার বিষণ্ণ মুখে!

‘ভূমিহীন’ আসপিয়ার
❏ শনিবার, ডিসেম্বর ১১, ২০২১ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা- সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার পর অবশেষে পুলিশের চাকরিটি পাচ্ছেন ভূমিহীন আসপিয়া ইসলাম কাজল। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পাচ্ছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই।

পুলিশের নিয়োগ পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হলেও আসপিয়া ভূমিহীন পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাঁর চাকরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল।

পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি পেতে সব ধাপ পেরিয়েছিলেন আসপিয়া ইসলাম। ফলাফলে বরিশালে মেধা তালিকায় হয়েছিলেন পঞ্চম। এরপরও চাকরি হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবার দরুন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন আসপিয়া।

আসপিয়া বলেন, ‘৭টি স্তর উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্ত নিয়োগের অপেক্ষায় ছিলাম। এমন সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, চাকরি পেতে হলে নিজেদের জমিসহ ঘর দেখাতে হবে। কিন্তু আমাদের কোনো জমি নেই। একজনের জমিতে বহু বছর ধরে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করছি। কিন্তু ভোটার আইডি, জন্মনিবন্ধন হিজলার বড়জালিয়া ইউপিতেই।’

আসপিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘জমি নেই এ জন্য চাকরি হবে না, এটা কোনোভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না।

আসপিয়ার এমন স্বপ্ন ভাঙার খবর ফেসবুকে বেশ আলোচনার ঝড় তোলে।

ভূমিহীন হবার কারণে পুলিশের চাকরি অনিশ্চিত হবার পর সামাজিক মাধ্যমে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখলেন,

“ভূমিহীন হলে পুলিশের চাকরি করা যাবে না—এরকম একটা আইন আছে, সেটাই তো জানতাম না। মেধা তালিকায় পঞ্চম হয়েও ভূমিহীন বলে বরিশালের আসপিয়া চাকরি পাবে না, এটা হতে পারে না। হতে দেওয়া যায় না। এই আইন বাতিল কিংবা সংশোধন করে তাকে চাকরি দেওয়া হোক। নইলে আমি অনশনে বসব।”

এরই মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুরের এক ব্যবসায়ী মেজবাহ উদ্দিন জানান, জমি না থাকায় চাকরি আটকে যাওয়া আসপিয়াকে তিনি জমি লিখে দিতে চান। আসপিয়া ও তাঁর অভিভাবক চাইলে যেকোনো সময় তিনি বিনা শর্তে তাঁকে জমি লিখে দেবেন। মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমার যথেষ্ট জমি আছে। তাই আমি তাঁর চাকরি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমি দিতে চাই।’

মানুষ হিসেবে আরেকটা মানুষের পাশে দাঁড়াতেই এটুকু করতে চান বলেও জানান মেজবাহ।

শেষ অবধি সবার প্রচেষ্টায় হাঁসি ফুটতে চলেছে আসপিয়ার বিষণ্ণ মুখে।

পুলিশের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আসপিয়া যাতে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পেতে পারেন, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ইতমধ্যেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক আসপিয়ার জন্য ঘর নির্মাণে হিজলা উপজেলা প্রশাসনকে সরকারি জমি খুঁজতে বলেছেন।

বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া শুক্রবার সকালে তাঁকে ফোন দিয়ে জানিয়েছেন, আসপিয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আসপিয়া যাতে কনস্টেবল পদে চাকরি পেতে পারেন সে জন্য সরকারি জমিতে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে আসপিয়ার জন্য জমির স্থান নির্ধারণ করতে হিজলার ইউএনওকে বলা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে আসপিয়ার জন্য ঘর নির্মাণ সম্ভব হবে।’

হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বকুল চন্দ্র কবিরাজ বলেন, ‘আসপিয়ার জন্য ঘর নির্মাণে বিকেলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খাসজমি ঘুরে দেখেছি। উপজেলার বড়জালিয়া ইউনিয়নে কয়েক শতাংশ জমি পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে সেখানে ঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জেলা প্রশাসকের মতামত পেলে কাজ শুরু হবে।’

এর আগে প্রকাশিত সংবাদ সুত্রমতে, আসপিয়া সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২০ সালে এইচএসসি পাস করেন। বরিশাল জেলায় পুলিশ কনস্টেবল পদে অনলাইনে আবেদন করলে গত ১৪, ১৫ ও ১৬ নভেম্বর জেলা পুলিশ লাইনে শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৭ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন।

২৩ নভেম্বর প্রকাশিত লিখিত পরীক্ষার ফলেও উত্তীর্ণ হয়ে ২৪ নভেম্বর একই স্থানে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। ২৫ নভেম্বর সাক্ষাৎকারের ফলাফলে মেধা তালিকায় পঞ্চম হন। ২৬ নভেম্বর জেলা পুলিশ লাইনে চিকিৎসকেরা মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এতেও উত্তীর্ণ হন আসপিয়া। সবশেষ ২৯ নভেম্বর সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ সবার ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন সেন্ট্রাল হাসপাতালে চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়। সেখানেও উত্তীর্ণ হন এই তরুণী।

এদিকে চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনে আসপিয়া ও তাঁর পরিবারকে ভূমিহীন উল্লেখ করা হয়। বুধবার জেলা পুলিশ সুপার বরাবর প্রতিবেদন জমা দেন হিজলা থানার উপপরিদর্শক মো. আশ্বাস। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় আসপিয়ার চাকরি হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়।

জানা যায়, আসপিয়া ইসলামের বাবা শফিকুল ইসলাম প্রায় তিন দশক আগে কাজের সন্ধানে বরিশালের হিজলা উপজেলায় আসেন। তবে তাঁর দাদার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায়। বরিশালের হিজলা উপজেলায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন শফিকুল। হিজলা উপজেলায় জন্ম হয় আসপিয়া ইসলামসহ তিন মেয়ে এবং এক ছেলের।

২০১৯ সালে শফিকুল ইসলামের মৃত্যু হয়। বর্তমানে তাঁর পরিবারের সদস্যরা হিজলা উপজেলার খুন্না-গোবিন্দপুর এলাকার মেজবাহ উদ্দিন অপু চৌধুরীর বাড়িতে ভাড়া থাকেন।