কক্সবাজারে ২ হাজার টাকার হোটেল ভাড়া এখন ৮ হাজার


❏ শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০২১ ফিচার

সময়ের কন্ঠস্বর ডেস্ক: একটানা তিনদিনের ছুটি উপলক্ষে পর্যটক গিজগিজ করছে কক্সবাজারে। এই শহরে একসঙ্গে রাত্রিযাপন করতে পারেন মাত্র এক লাখ বিশ হাজার পর্যটক। কিন্তু ছুটির প্রথমদিনই প্রায় দেড় লাখ ভ্রমণকারী এসেছেন শহরে। পরেরদিন এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। এই সুযোগে হোটেল-মোটেলের ভাড়া চার থেকে পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে দালালরা। অনেক পর্যটকই থাকার জায়গা না পেয়ে সৈকত বা রাস্তায় রাত পার করতে বাধ্য হয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটবে এটা আঁচ করতে পেরে এক শ্রেণির দালাল আগে থেকে নিজেদের নামে হোটেল রুম বুকিং করে কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করেছে। তারাই অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়। এক হাজার টাকার রুম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা, ২ হাজার টাকার রুম ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা, ৩ হাজার টাকার রুমের ভাড়া বেড়ে হয়েছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা।

অনেক পর্যটক হোটেলে ঠাঁই না পেয়ে রাত্রিযাপন করেছেন যাত্রীবাহী বাস, সৈকতের কিটকট চেয়ারে (বিনোদন ছাতা), কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনের ফুটপাত এবং দোকানের বাইরের বারান্দায়। অনেকে সৈকতের খোলা আকাশের নিচেও রাত কাটিয়েছেন। কেউ কেউ স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতে অবস্থান নিয়েও রাত্রীযাপন করেছে বলে জানা গেছে। বিকল্প স্থানে থাকতে গিয়ে এসব পর্যটকদের মোটা টাকা গুনতে হয়েছে।

সবচাইতে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পরিবারসহ ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের। পরিবার পরিজন নিয়ে স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতে থাকতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হন এসব পর্যটক। বাস-ফুটপাতে রাত কাটালেও শৌচাগার না পেয়ে দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকরা। শৌচাগার নিয়ে নারীই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পেয়েছেন। গণশৌচাগার না পেয়ে অনেকে খোলা জায়গায়, রাস্তার ধারে মলমূত্র ত্যাগ করেছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ভোগান্তি ও হয়রানির মুখে অনেক পর্যটক ভ্রমণসূচি সংক্ষিপ্ত করে ফিরে গেছেন বলেও খবরও পাওয়া গেছে।

আগাম রুম বুকিং না দিয়ে পরিবার, স্বজন মিলিয়ে ২২ জনের টিম নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন ঢাকার কেরানিগঞ্জের মোর্তোজা মোরশেদ। তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে সর্বত্র ভয় কাজ করছে। এজন্য মনে করেছিলাম বেড়াতে কম লোক বের হবেন। কিন্তু আমার ধারণা শুধু ভুলই প্রমাণ হয়নি, আমাদের ভ্রমণটাই চরম ভোগান্তির উদহারণ হয়েছে। আমাদের মতো অপরিকল্পিত ভ্রমণে এসে সৈকত তীর, বালিয়াড়ি, রাস্তার ধারে পার্ক করা গাড়িতে বা ফুটপাতে এবং দোকানের সামনে বসে রাত পার করতে হয়েছে অসংখ্য পর্যটককে। সাথে শৌচ নিয়েও দূর্ভোগ আছে।’

মোরশেদের মতোই ভোগান্তির কথা জানান, সিলেটের সুনামগঞ্জ থেকে আসা প্রসেনজিত দাশ ও কিশোরগঞ্জ সদরের শফিকুল ইসলাম। তারা জানিয়েছেন, পরিচিত কয়েকজন বলছিলেন আগে হোটেল বুকিং দিতে। তখন মনে করেছিলাম করোনা ও তার নতুন ভেরিয়েন্ট ওমিক্রণের ভয়ে হয়তো লোকজন তেমন আসবেনা কক্সবাজার। তাই ওয়াকিং গেস্ট হিসেবে রুম পাওয়া যাবে। কিন্তু পরিবার নিয়ে এসে রুম না পেয়ে যে ভোগান্তি পেয়েছি তা আজীবন মনে থাকবে।

পর্যটকরা প্রশাসনের কাছে না যাওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি উল্লেখ করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেয়ে সী-পার্ল-১ ও ২ নামে ফ্ল্যাট আবাসনে শুক্রবার অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসময় অতিরিক্ত নেয়া টাকা ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি এ ফ্ল্যাট পরিচালকদের ৫ হাজার টাকা এবং অপর আবাসন প্রতিষ্ঠান হোটেল ওপেলাকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

হোটেল সী নাইট’র ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী বলেন, আমাদের পর্যটকরা এখনো অপরিকল্পিত ভ্রমণে বের হন। ডিজিটাল সময় হিসেবে সব হোটেল-গেস্ট হাউজের যোগাযোগ নাম্বার ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেইজে দেয়া আছে। সেখানে যোগাযোগ করে সরাসরি বুকিং দিলে ঠকতো কম। এছাড়াও সবাই শুধু বন্ধের দিনগুলোতে আসার জন্য মুখিয়ে থাকেন। যার ফলে চাপের কারণে থাকা-খাওয়া সবখানেই বাড়তি টাকা গুনতে বাধ্য হন। সাপ্তাহিক খোলার দিনগুলোতে বেড়াতে আসা বুদ্ধিমান পর্যটকের কাজ।

ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি মো. জিল্লুর রহমান জানান, ধারণা চেয়ে পর্যটকের সংখ্যা বেশি এসেছে কক্সবাজারে। একসঙ্গে অসংখ্য পর্যটক সমাগম ঘটায় সীমিত জনবল দিয়ে পর্যাপ্ত সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এরপরও সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধে সচেষ্ট রয়েছি আমরা।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, এক সাথে বিপুল পর্যটক সমাগম হওয়ায় চাপ বেড়েছে। এরপরও যারা নিয়ম না মেনে পর্যটক ঠকাচ্ছে বলে প্রমাণ মিলছে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।