• আজ মঙ্গলবার, ৪ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

কক্সবাজারে ‘মাদকবিরোধী বয়ান করায়’ রোষানলে মাদ্রাসা শিক্ষক

Cox's Bazar news
❏ শনিবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০২১ চট্টগ্রাম, দেশের খবর

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজার সদরের বাংলাবাজারে সক্রিয় একটি মাদক পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক আলোচনা এবং ওয়াজনসীহতে বয়ান করায় ওই চক্রের রোষানলে পড়েছেন মাদ্রসা শিক্ষক মাওলানা খাইরুল বশর সিরাজী।

তিনি সদরের বাংলাবাজারস্থ ছুরতিয়া সিনিয়র ফাযিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ঝিলংজা কেন্দ্রীক একটি মাদক পাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসা শিক্ষক খাইরুলের বিরুদ্ধে এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। তারা একাজে রিয়াদ মো. জিসান নামে স্থানীয় এক যুবককে ব্যবহার করছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাকে স্পর্শকাতর একটি ঘটনার ভিকটিম সাজিয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে হয়রানিমূলক অভিযোগ দায়েরসহ আরও বিভিন্ন ধরণের অপকর্ম করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

জানা যায়, শুক্রবার ২৪ ডিসেম্বর ভোর বেলায় বাংলাবাজারের মৌলভীপাড়ার বিভিন্ন অলিগলিতে মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা খাইরুল বশর সিরাজীর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা লিখে পোস্টার সাঁটানো হয়। এসব পোস্টার নজরে এলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ, জনপ্রতিনিধি ও সমাজ কমিটির লোকজন নড়েচড়ে বসে। যুবক এবং ওই মাদকচক্রের এমন কান্ডজ্ঞানহীন কাজে হতভম্ব সবাই। এলাকার নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিবর্গ জিসানের এই কাজে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছেন।

অভিযুক্ত জিসানের চাচা গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন- মাওলানা খাইরুল সাহেব একজন বয়োবৃদ্ধ লোক। তিনি ইতিমধ্যে ছেলের জন্য বউ এনেছেন, মেয়েও বিয়ে দিয়েছেন। তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তিনি প্রায় সময় ওয়াজ নসীহত এবং খুতবায় মাদক, ইয়াবা পাচার এবং অশ্লীলতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক বয়ান করে থাকেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই চক্রটি আমার ভাতিজাকে এমন একজন পরহেযগার আলেমের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং কুরুচিপূর্ণ অভিযোগ এনে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে।

জিসান এক সময় ভালো মেধাবী ছাত্র ছিলো। তার মেধাকে নষ্ট করেছে এলাকার কিছু বাজে ছেলে। ওইসব মাদক ব্যবসায়ী ছেলেদের সাথে চলাফেরা করতো বলে জিসানকে এর আগেও একাধিকবার সমাজ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু এরপরও ছেলেটি সংশোধন হচ্ছে না। এখন উল্টো তাদের সাথে হাত মিলিয়ে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে একজন আলেমের বিরুদ্ধে বেআইনী পোস্টারিং করে যাচ্ছে। এসব কারণে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে চলে যাচ্ছে। অচীরেই এই ছেলেকে এখানেই থামানো দরকার।

অতীতে বিভিন্ন সময় অপকর্মের দায়ে এলাকা থেকে বের করে দেওয়ার বিষয়টি জিসান নিজেই স্বীকার করে জানিয়েছে- সে স্কুলের মেধাবী ছাত্র। নিয়মিত পড়াশোনা করে। স্কুলেও গমন করে। কিন্তু এলাকার লোকজন কেনো তাকে সমাজচ্যুত করতে চায় সেটা তার ঠিক বোধগম্য নয়।

অন্যদিকে জিসানের ব্যাপারে জানতে তার অধ্যয়নরত স্কুল খরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে শ্রেণীশিক্ষক জানিয়েছেন- জিসান অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত ভালো পড়াশোনা করেছে। কিন্তু এরপর থেকে গত দুই বছর ধরে তার গতিবিধি সন্দেহজনক এবং স্কুলেও নিয়মিত নয়। করোনাকালীন সময়েও বড় ধরণের একটি গ্যাপ ছিলো। তখনও তাকে পড়াশোনায় খুব একটা অগ্রসর হতে দেখা যায়নি।

এছাড়াও অভিযুক্ত জিসানের ভাই রফিকের সাথে কথা হলে তিনি মুঠোফোনে জানান- ঘটনাটি শুনেছি। তবে হুজুরের বিরুদ্ধে নোংরা পোস্টার কে বা কারা সাঁটিয়েছে তিনি জানেন না। তৃতীয় কোনো পক্ষ হয়তো এটা করেছে।

তবে কার্যত পোস্টারে দেখা গেছে তার ভাই জিসানের পক্ষ থেকে বর্ণিত গল্পটিই ছাপানো হয়েছে এবং সেখানে মাওলানার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। একজন ছাত্রের পক্ষে এতবড় মেগা সাইজের পোস্টার বানানোর টাকা আসলো কীভাবে এবং কেউ যদি তাকে দিয়ে এই টাকা দিয়ে থাকে তাহলে তারা কারা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন লাইন কেটে দেন।

ছুরতিয়া ফাযিল মাদ্রাসার আরবী প্রভাষক মাওলানা জহিরুল হক এবং সাইদুল হকের সাথে কথা হলে তারা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন- প্রিন্সিপাল হুজুর যথেষ্ট বয়স্ক এবং প্রাজ্ঞ শিক্ষক। তিনি কুতুবদিয়া এলাকা থেকে এখানে এসেছেন শিক্ষক পেশাকে অবলম্বন করে। এলাকার মানুষই তাকে শ্রদ্ধা করে সম্মান করে এখানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনিও উক্ত এলাকার জনমানুষের কল্যাণে শিক্ষাকে অগ্রসর করতে এলাকায় স্থায়ী বসবাস করতে শুরু করেন। টাকা খরচ করে জমি কিনে ঘর বাড়ি করেন। এখানেই পরিবার পরিজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আছেন। সুতরাং তার বিরুদ্ধে হঠাৎ করে কোনো স্পর্শকাতর অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালানো হলে এটা শুধু মাদ্রাসা ক্যাম্পাস নয় পুরো এলাকার কোনো মানুষই মেনে নিবে না।

এ ব্যাপারে স্থানীয় মেম্বার সলিম জানিয়েছেন- জিসান ছেলেটা গত দুয়েক বছর ধরে একেবারেই বকে গিয়েছে। কতিপয় বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। অন্যদিকে খাইরুল হুজুর একজন নামাজী এবং পরহেযগার ব্যাক্তি। উনার চাল চলন এবং জীবন মান আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। মাদক ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট হুজুরের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষিপ্ত ছিলো। তারাই মূলত জিসানকে ব্যবহার করে হুজুরের বিরুদ্ধে একটি স্পর্শকাতর অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভুক্তভোগী মাওলানা খাইরুল হক সিরাজী জানান, মৌলভীপাড়া গ্রামটি অত্যন্ত সভ্যশান্ত একটি এলাকা ছিল এক সময়। সম্প্রতি এলাকায় অসামাজিক কার্যকলাপ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের উপদ্রব বৃদ্ধি পেলে আমি আমার সামাজিক ও নৈতিক অবস্থান থেকে এসবের বিরোধিতা করে আসছি। সেই সাথে ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছি। এর জের ধরে চিহ্নিত ওই মাদক ব্যবসায়ী চক্র এবং অসামাজিককাজে জড়িত কতিপয় লোকজন একটি কিশোরকে ব্যবহার করে আমার সামাজিক মান মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং আইনীভাবে হয়রাণি করতে এ ধরণের চক্রান্তে মেতেছে। এ ঘটনায় আমি খানিকটা বিব্রতবোধ করছি। ফলে আমি আইনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হলাম। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেছি। আশা করছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার সদর মডেল থানার তদন্ত (ওসি) কর্মকর্তা বিপুল চন্দ্র জানান, বাংলাবাজারে একটি মাদ্রাসার হুজুরের ব্যপারে টিএনও স্যারের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশনা পেয়েছি। ঘটনাটি একজন অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে কতটুকু কি করলেন জেনে বলতে হবে। যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন সেহেতু ঘটনার বাদী বিবাদী কেউই একে অপরকে ঘায়েল করতে কোনো বেআইনী পদক্ষেপ বা হস্তক্ষেপ করলে সেটাও আমলে নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।