• আজ মঙ্গলবার, ২১ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ৬ ডিসেম্বর, ২০২২ ৷

ফিরে দেখা ২০২১: বছরজুড়ে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও সহিংসতা

ফিরে দেখা ২০২১
❏ শুক্রবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০২১ ফিচার

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা: ২০২১ সালে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে অন্তত ৫৯৬ শিশু নিহত হয়েছে।

এছাড়া ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৭৪ শিশু এবং বলাৎকারের শিকার ৭৮ ছেলে শিশু।

২০২১ সালে সারাদেশে অন্তত ১ হাজার ৩২১ জন নারী ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

এছাড়াও, ২০২১ সালে অন্তত ৮০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ারে ৫১ জন, নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে ৮ জন, কারাগারগুলোতে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে ৮১ জন মারা গেছেন।

শুক্রবার (৩১ ডিসেম্বর) এসব তথ্য জানায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২১: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশু অধিকারের ক্ষেত্রে ২০২১ সালের চিত্র ছিল হতাশজনক। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার, অনলাইনে যৌন হয়রানিসহ শিশুর প্রতি নানা সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত থেকেছে বছরজুড়ে।

 ‘আসক তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের হিসাব মতে, সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২১ সালে শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয় মোট ৫৯৬ শিশু।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে নিহত শিশুর সংখ্যা ছিল ৫৮৯। এছাড়া ২০২১ সালে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ১৪২৬ শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ৭৭৪ শিশু ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানীর শিকার হয় ১৮৫ শিশু এবং বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৭৮ ছেলে শিশু।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মূল প্রতিবেদনে বলা হয়, আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২১ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ১ হাজার ৩২১ জন নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন নয়জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ১ হাজার ৬২৭ জন নারী এবং ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪১৩ জন নারী।

এতে আরও বলা হয়, বিগত বছরের ন্যায় এ বছরও করোনা মহামারির মধ্যে ধর্ষণ, যৌন হযরানি, পারিবারিক নির্যাতন, সালিশ ও ফতোয়াসহ নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

ক্রসফায়ার/ বন্দুকযুদ্ধ/ গুলিবিনিময়ে নিহত:

আসক তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ার/বন্দুকযুদ্ধ/গুলিবিনিময়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন।

হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু:

আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের হিসাব মতে, ২০২১ সালে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নিহত হয়েছেন ৮ জন। এর মধ্যে গ্রেফতারের পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শারীরিক নির্যাতনে ৬ জন, হার্ট অ্যাটাকে ১ জন এবং গ্রেফতারের আগে শারীরিক নির্যাতনে নিহত হন ১ জন।

অন্যদিকে এ বছর দেশের কারাগারগুলোতে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে মারা গেছেন ৮১ জন। এর মধ্যে কয়েদি ২৯ জন এবং হাজতি ৫২ জন। ২৮ মে খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে মিলন বিকাশ ত্রিপুরা নামে এক বন্দি মারা যান। তার মাথায় আঘাত ও গলায় গামছা পেঁচানোর দাগ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুম:

আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যম বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার গুমের বিষয়ে বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। অপরদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বলছে, গুম-খুন নিয়ে তদন্ত করার ক্ষেত্রে তাদের আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আসকের তথ্যানুসন্ধানে শুম বা অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, স্বজন বা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, গুমের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য; বিশেষ করে র‍্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে সাদা পোশাকে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হয় এবং এরপর সংশ্লিষ্ট বাহিনী তাদের গ্রেফতার বা আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংগৃহীত আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হন ৭ জন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৬ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ১ জন।

গৃহকর্মী নির্যাতন ও অ্যাসিড নিক্ষেপ

আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে ৪৫ নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পরবর্তী সময়ে মারা যান ৩ নারী। অন্যদিকে এ বছরে অ্যাসিড নিক্ষেপের শিকার হয়েছেন ২৩ নারী।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা

আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২০৪টি প্রতিমা, পূজামণ্ডপ, মন্দির ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৮৪টি বাড়িঘর ও ৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সাম্প্রদায়িক হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩ জন নিহত হন এবং কমপক্ষে ৩০০ জন আহত হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ২০২১ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির ও সহকারী সমন্বয়কারী অনির্বাণ সাহা।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন আসক নির্বাহী কমিটির মহাসচিব মো. নূর খান। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আসকের নির্বাহী পরিচালক গোলাম মনোয়ার কামাল ও পরিচালক নীনা গোস্বামী।