🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ শুক্রবার, ১৪ মাঘ, ১৪২৮ ৷ ২৮ জানুয়ারি, ২০২২ ৷

বিশেষজ্ঞের পরামর্শে জরায়ু ক্যানসার: কারণ লক্ষন ও প্রতিকার

জরায়ু ক্যানসারের
❏ রবিবার, জানুয়ারী ২, ২০২২ আপনার স্বাস্থ্য, স্পট লাইট

সময়ের কণ্ঠস্বর, স্বাস্থ্য ডেস্ক :  আমাদের দেশের নারীরা সাধারণত কয়েক ধরনের রোগে বেশি ভোগে। এর মধ্যে-পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা, জরায়ু মুখে ক্যানসার এবং ব্রেস্ট ক্যানসার অন্যতম।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউটেরাসের বিভিন্ন অংশের মধ্যে জরায়ুর মুখ ক্যানসার হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ জরায়ু মুখ ক্যান্সার। বাংলাদেশে ক্যান্সারাক্রান্ত নারীদের মধ্যে শতকারা ৩০ ভাগই হচ্ছেন জরায়ু মুখ ক্যান্সারের শিকার। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার নারী জরায়ুর মুখের ক্যান্সারে নতুনভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।

এই ক্যানসারের সঠিক চিকিৎসা করা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আর যারা প্রথম থেকেই চিকিৎসা করান, তাদের বেঁচে থাকার সম্ভবনা ৯৫ শতাংশ।

দেশে প্রতিবছর ৮ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ রোগে মৃত্যু হয় ৫ হাজারেরও বেশি নারীর। এ প্রাণহানি কমাতে প্রয়োজন এ রোগের কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধের উপায় ও চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে রাখা।

এ সম্পর্কে ডক্টরটিভিতে করা এক আলোচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনোকলজিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারহানা খাতুন এ বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য ও পরামর্শ জানিয়েছেন।

জরায়ুমুখ ক্যানসার বলতে কী বোঝায়, কত ধরনের?

নারীদের প্রজননতন্ত্র জরায়ুর দুটি অংশ। একটি হলো বডি, আরেকটি হচ্ছে জরায়ুমুখ, যেটাকে সার্ভিক্স বলা হয়। এই সার্ভিক্সে যখন হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) দিয়ে কিছু পরিবর্তন হয়ে অনেকগুলো ধাপের মাধ্যমে জরায়ুমুখে ঘা হয় সেটাই হচ্ছে জরায়ুর ক্যানসার। জরায়ুর বডির ক্যানসার আর জরায়ুর ক্যানসার দুটোর কারণও একদম ভিন্ন।

জরায়ুমুখের ক্যানসারের সাধারণত যে রিসপেক্টরগুলো আছে, সেগুলো হলো- খুব অল্প বয়সে যাদের বিয়ে হয়, খুব কম বয়সেই বেশ কয়েকটি সন্তান জন্মদান করা, কম বয়সেই প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়া ইত্যাদি কারণে জরায়ুমুখের ক্যানসার হয়ে থাকে।

জরায়ু ক্যানসারের লক্ষণ বা উপসর্গ

জরায়ুমুখ ক্যানসারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ৭০ ভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগ অ্যাডভান্সড স্টেজে ধরা পড়ে। প্রথমদিকে এই রোগের কোনো লক্ষণ থাকে না। এরপর যখন লক্ষণ প্রকাশ পায় তখন সেটা অ্যাডভান্সড হয়ে যায়। এ কারণেই জরায়ু ক্যানসারকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হয়ে থাকে।

নিন্মাঙ্গের চারপাশে চাপ লাগা কিংবা ঘন ঘন মূত্রত্যাগ করা।

** গ্যাস, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য। হালকা খাবারের পর পেট ভর্তি লাগা, পেটে অস্বস্তি লাগা, ইত্যাদি পেটের কোন সমস্যা খুব বেশি হলে তা জরায়ু ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে।

** পেটে অতিরিক্ত ব্যথা কিংবা পেট ফুলে থাকা, সঙ্গে বমি বমি ভাব কিংবা বার বার বমি হওয়া। এর ফলে খিদে কমে যায়।

** অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি পাওয়া বা হঠাৎ করে ওজন অনেক কমে যাওয়া।

** প্রথম দিকে রোগীর সাদাস্রাব হয়। অনেক সময় গন্ধযুক্ত বা রক্তমিশ্রিত সাদাস্রাব হয়।

** যৌন সম্পর্কে রক্ত যাওয়া জরায়ু ক্যানসারের এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এজন্য সহবাসে কারও রক্ত গেলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

** মাসিক অনিয়মিত হওয়া। দুই মাসিকের মাঝে অনিয়মিত রক্তস্রাব অথবা মাসিক এতবেশি অনিয়মিত হচ্ছে যে মাসিকের তারিখ শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

** মেনোপোজ হওয়ার পরও যদি কোনো নারী রক্তক্ষরণ দেখা যায়, তাহলে সেটিও জরায়ু ক্যানসারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। সেক্ষেত্রে দ্রুত তাকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

** এ ছাড়া তলপেটে ব্যথা, ব্যাকপেইন বা পা ফুলে যাওয়া ও পায়ে পানি আসা জরায়ু ক্যানসারের অ্যাডভান্সড স্টেজের লক্ষণ।

জরায়ু ক্যানসার হওয়ার কারণ কী?

** কম বয়সে অর্থাৎ ১৩-১৪ বছর বয়সে কোনো মেয়ের বিয়ে হলে তার যোনিপথের কোষ কলাগুলো পরিণত হওয়ার আগেই সে যৌন সংস্পর্শে আসছে। এটি জরায়ু ক্যানসারের জন্য বড় এক ঝুঁকির কারণ।

** যারা কম বয়সে বাচ্চা নেয়, যারা অনিরাপদ সঙ্গম চর্চা করে, শারীরিক সম্পর্কের জন্য যাদের একাধিক সঙ্গী থাকে, শারীরিক সম্পর্কের সময় যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না ও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন নারীদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস ক্যানসারে রূপান্তরিত করে।

এসব কারণেই জরায়ু ক্যানসারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উচ্চ ঝুঁকিতে। কারণ, এই ক্যানসারের যতগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর আছে তা সবই বাংলাদেশে আছে।

জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধে করণীয়

প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধ করতে ১৩-১৫ বছরের কিশোরীদের টিকা দিতে হবে। এই ভ্যাকসিনের ১০০ ভাগ সুফল পাওয়া যায়। তবে তাদেরকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জরায়ু ক্যানসার প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

দ্বিতীয় প্রতিরোধ হলো- স্ক্রিনিং সেন্টারে গিয়ে সুস্থ মায়েদের স্ক্রিনিং করতে হবে। স্ক্রিনিংয়ে ৩টি পদ্ধতি আছে। এগুলো হলো- পেপস স্মেয়ার টেস্ট, ভায়া টেস্ট ও এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট। এই টেস্টগুলোর মাধ্যমে জরায়ু মুখের ক্যানসারের পূর্ব লক্ষণ শনাক্ত করা যায় এবং চিকিৎসা দেওয়া যায়।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

এই রোগের জন্য এখন সরকারিভাবে একটা টেস্ট আছে। একে বলা হয় ভায়া। এটা সব সরকারি হাসপাতালগুলোতে আছে। এই ভায়া টেস্টটা বিনামূল্যে করা হয়। ভায়া টেস্টের মাধ্যমে দুটো জিনিস নির্ণয় করা যায়। একটা হচ্ছে জরায়ুর মুখে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা আছে নাকি নেই।

এজন্য ভায়া টেস্টের পর দু’ধরণের কার্ড দেয়। একটা হচ্ছে লাল কার্ড। অন্যটি হচ্ছে নীল কার্ড। নীল কার্ড যাদের দেওয়া হয়, তাদের বলা হয়, আপনার জরায়ুতে এখন পর্যন্ত ক্যানসারের কোনো লক্ষণ এখন পর্যন্ত নেই। আপনি তিন বছর পর আবার পরীক্ষা করতে আসবেন। আর যাদের লাল কার্ড দেওয়া হয় তাদের বলা হয় আপনার জরায়ুতে ক্যান্সারের সম্ভাবনা আছে। আপনি নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে কল্পোস্কপি বা বায়োপসি করানোর পরামর্শ দেয়া হয় ।

হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকেরা তাদের জরায়ুর মুখ থেকে অল্প একটু টিস্যু নিয়ে বায়োপসি করেন। বায়োপসি রিপোর্টে যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে তখন তার চিকিৎসা করা হয়। জরায়ুর মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধের কিছু ভালো উপায় আছে। সেটা হচ্ছে ভ্যাকসিন।

ভ্যাকসিন পদ্ধতিতে চিকিৎসা

আমাদের দেশে এখন দুধরনের ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে। একটা হচ্ছে সার্ভারিস্ক ভ্যাকসিন, অন্যটা হচ্ছে গার্ডাসিল ভ্যাকসিন। তবে এই ভ্যাকসিনগুলো এখনো পর্যন্ত সরকারিভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো বিভিন্ন ভ্যাকসিন সেন্টারে টাকার বিনিময়ে দিচ্ছে।

এতে তিন- চার হাজার টাকা একজন রোগীর খরচ হয়। প্রতিটা ভ্যাকসিন তিন ডোজ করে দেওয়া হয়। এই ভ্যাকসিন নিলে নারী মোটামুটি একটা প্রোটেকশানে থাকে যে তার জরায়ুমুখে ক্যান্সার হবে না। তবে আমি যে এইচপিভি ভাইরাসের কথা বললাম তার অনেক টাইপ আছে। হাজারটা টাইপ আছে।

আমাদের যে ভ্যাকসিন তা সর্বোচ্চ চারটা টাইপের বিরুদ্ধে কাজ করে। বাকি যে টাইপগুলো আছে তার বিরুদ্ধে কিন্তু কাজ করে না। কাজেই কারো যদি এইচপিভি ভাইরাসের চারটা ধরণ ছাড়া অন্য কোন ধরণ দিয়ে আক্রমণ করে তাহলে কিন্তু ভ্যাকসিন কাজ করে না। তার মানে ভ্যাকসিন শতভাগ প্রতিরোধকারী তা কিন্তু নয়।

অর্থাৎ ভ্যাকসিন নিলে তার আর কখনো জরায়ুমুখের ক্যান্সার হবে না এমন ধারণা ঠিক নয়। যেসব ক্ষেত্রে স্বামী- স্ত্রী বা নারী পুরুষের একাধিক যৌনসঙ্গী আছে বা খুব অল্প বয়সে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছে তাদের আমরা কনডম ব্যবহার করতে বলি। একমাত্র এই পদ্ধতির মাধ্যমেই এই ভাইরাসটাকে প্রতিরোধ করা যায়।

জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের আগ মুহুর্তে যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে তাহলে লোকাল কিছু থেরাপি দিয়ে যেটাকে আমরা বলি হট থেরাপি।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই থেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ ওই জায়গাটাকে পুড়িয়ে জীবানুটাকে ধ্বংস করে দেওয়া। এটাকে ক্রায়ো বলে।

এছাড়া যদি ক্যান্সার হয়েই যায় সেক্ষেত্রে পুরো জরায়ুটাকে ফেলে দিতে হবে। এটা বিশেষ ধরনের জরায়ুর অপারেশন যার ফলে জরায়ু ও আশপাশের সম্ভাব্য এলাকা ফেলে দিতে হয়। শুধু অপারেশন করলেই সমাধান হয় না। পরবর্তীতে রেডিওথেরাপী দিতে হয়।

ফুল কোর্স রেডিও থেরাপি দেওয়ার পরেও কিন্তু সারাজীবন ফলোআপে থাকতে হয়। সারা জীবন কিছু পরীক্ষা নীরীক্ষা করে ছয় মাস – এক বছর পরপর ডাক্তারের কাছে আসতে হয়। একবার যদি জরায়ুর ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে তাহলে কিন্তু সারা শরীরে এমনকী ব্রেনেও পরবর্তী প্রভাব রেখে যেতে পারে।

জরায়ুমুখের ক্যানসারটা খুব কমন ক্যান্সার। যেসব কারণে মেয়েরা এই ক্যানসারে আক্রান্ত হয় তা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলে এই ক্যান্সার অনেকখানি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমি বলব, আপনারা ভ্যাকসিনটা নিয়ে ফেলুন। ভ্যাকসিন শতভাগ না হলে ৭০-৮০% কাভারেজ দেয়।

জরায়ুর মুখ সুরক্ষিত রাখতে , মায়েদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা অন্তত প্রতি তিন বছর পরপর ভায়া টেস্ট করানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন ।