• আজ সোমবার, ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৩ মে, ২০২২ ৷

কেরানীগঞ্জে দিনদিন কমছে কৃষি জমির পরিমাণ

news photo n
❏ মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২২ ঢাকা, দেশের খবর

মাসুম পারভেজ, সময়ের কণ্ঠস্বর: ঢাকার কেরানীগঞ্জে সরকারি অনুমোদন ছাড়া বিঘা বিঘা ফসলি জমি দখল করে অসংখ্য অবৈধ হাউজিং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। সরকারের বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের নাকের ডগায় দাপটের সঙ্গে উজাড় হচ্ছে ফসলি জমি।

একসময় কেরানীগঞ্জের অধিকাংশ জমিতে এই চলতি মৌসুমে দেখা যেতো শীতের নানা ধরনে সবজি আর শর্ষের বিস্তীর্ণ মাঠ। সেখানে এখন অধিকাংশ জমিতে লক্ষ্য করা যায় বালু ভরাট করে হাউজিং প্রকল্পের সাইনবোর্ড।

উপজেলার শুভাঢ্যা, বাস্তা, রুহিতপুর, শাক্তা ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে এক সময়ের ফসলি জমিগুলোতে এখন তাকালেই দেখা যায় বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পের বৈধ অবৈধ সাইনবোর্ড। আবার কেরানীগঞ্জের অনেক জায়গাই খাল ভরাট করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম সেচের পানির অভাব। পুরো কেরানীগঞ্জ জুড়ে সক্রিয় রয়েছে এক শ্রেণীর আমলা ও প্রভাবশালী মহলের ভূমিখেকোরা। যারা নিরীহ ও দরিদ্র কৃষকদের নানা কায়দায় বিপাকে ফেলে কম দামে হাতিয়ে নিচ্ছে কৃষি জমিগুলো।

জানা যায়, ঢাকার উপকণ্ঠে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ১৬৭ বর্গ কিলোমিটার সীমানা নিয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা। ঔপনেবিশিক আমল থেকেই এ অঞ্চলে মানুষের বসবাস থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য, যোগাযোগ, কৃষি কাজসহ জীবিকা উপার্জন ইত্যাদি কাজের জন্য ছিল মানুষের আনাগোনা।

আধুনিক ঢাকার অতি নিকটে হওয়ায় ও ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ের বিশেষ অংশ কেরানীগঞ্জের মধ্যে পড়াতে এবং সারা বাংলাদেশের রোল মডেল উপজেলা শহর হিসাবে তুলে ধরার জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প হওয়াতে বদলে গেছে কেরানীগঞ্জ উপজেলার ভূমির চিত্র। হঠাৎ করেই ভরে ফেলা হচ্ছে খাল-বিল, পুকুর, ডোবা-নালাসহ কৃষিজমিও। বসবাসের জন্য ভূমির চাহিদা বেড়ে যাওয়াতে অন্যান্য খাতের ভূমিগুলোও অবৈধভাবে তৈরি করা হচ্ছে আবাসন প্রকল্প, রাস্তাঘাটসহ হাটবাজার ইত্যাদি ।

আরও জানা যায়, কেরানীগঞ্জ উপজেলাটিতে কৃষি জমির পরিমাণ হচ্ছে ৮৭২৫ হেক্টর। এ অঞ্চলের কৃষি জমিগুলোতে প্রধানত বোরো ধান, সরিষা ও বিভিন্ন প্রকার সবজি উৎপাদন করা হয়। আর এসব ফসলি জমি থেকে যা কিছু উৎপাদিত হয় তা ঢাকাসহ আশপাশের অঞ্চলের মানুষের চাহিদা পূরণ করা হয়। ঢাকার অতি সন্নিকটে হওয়ায় ও ঢাকা-মাওয়া পদ্মা সেতুর মহাসড়ক তৈরি হওয়াতে এখানে মানুষের আবাসনের জন্য ব্যাপক আকারে হাউজিং হচ্ছে। আর এসব হাউজিং প্রকল্পগুলো কোন নীতিমালা না মেনেই কৃষি জমি ধ্বংস করে গড়ে উঠছে।

আর এতে করে কেরানীগঞ্জের কৃষিজমি থেকে প্রতি বছরই ০.৫৭ শতাংশ কমছে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিলেও কেরানীগঞ্জে এর ছিটা ফোঁটা চোখে পড়ে না। যত্রতত্র ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাট করে নষ্ট করা হচ্ছে কেরানীগঞ্জের হাজার হাজার বিঘা জমি। আর এতে বিপাকে পড়ছে কেরানীগঞ্জের হাজার হাজার মেহনতী কৃষক। আবার অনেকে সেচের পানির অভাবেও কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছে। এতে করে হুমকির মুখে পড়ছে কেরানীগঞ্জে কৃষি ব্যবস্থা ও পরিবেশ।

এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বাপদাদার সম্পত্তিগুলোতে এলাকার মুখোশধারী ভূমি দস্যুদের চোখ পড়েছে। উজাড় করে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের ফসলি জমি। এইসব কালো থাবা থেকে আমরা মুক্তি চাই। স্থানীয়রা দাবি করেন, এসব অবৈধ হাউজিং প্রকল্প করার জন্য উপজেলার জনপ্রতিনিধিরা তাদের সহযোগিতা করছে প্রকাশ্যে। এতে করে উপজেলার সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ তাদের ফসলি জমি হারিয়ে পথে বসেছে বলে জানান তারা।

নামে প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জনপ্রতিনিধি বলেছেন, গেল এক দশকে ফসলি জমির পরিমাণ ক্রমেই কমে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত আবাসন ও নগরায়ণের ফলে ক্রমাগত কৃষি জমি কমছে। কবে কোথায় কিভাবে তারা এগুলো করছে, কে তাদের অনুমতি দেয় কিছুই জানি না।

সরজমিনে সারা কেরানীগঞ্জে ঘুরে দেখা যায়, এক সময় ৫২টি খাল থাকলেও বর্তমানে ১৭/১৮টি খালের চিহ্ন পাওয়া যায় আর কেরানীগঞ্জের কৃষি জমিগুলো এ খালগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে খাল ও কৃষি জমিগুলো বলতে গেলে নেই।

রাজেন্দ্রপুর এলাকার কৃষক বাহের আলী জানায়, উপজেলার কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় একশ্রেণীর ভূমিদস্যু আছে যারা কৃষিজমি তাদের দখলে নেয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট করে ফেলছে। খালগুলোতে ময়লা আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলে ভাগাড়ে পরিণত করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। আর এতে করে সেচের পানির অভাবে অনেকেই কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশার দিকে চলে যাচ্ছে।

আবার অনেকে অভিযোগ করে বলেন, বলা নাই কওয়া নাই হঠাৎ দেখি জমিতে বালু ভরাট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বলে পাশের জমিটা তাদের আর তাদের জমি ভরাট করতে গিয়েই আশপাশের বেশ কয়েকটি জমিতেও বালু ভরাট হয়ে গেছে। ভরাটকারীরা তখন আশপাশের যেসব জমি ভরাট করে ফেলেছে সেই ভরাটের টাকাও দ্বিগুণ-তিনগুণ চায়। অনেক সময় সেই বালু ভরাটের টাকা না দিতে পারলে জমি তাদের কাছে বিক্রি করে দিতে হয়। অনেকে প্রভাবশালীদের ভয়ে কমদামে তাদের জমি বিক্রি করে দিচ্ছে। তাই এসব এলাকার কৃষকদের দাবি কৃষি জমি রক্ষা করে পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প করা হোক ও কেরানীগঞ্জের সমস্ত খাল পুনরুদ্ধার করে কৃষি জমিতে সেচের পানির সুব্যবস্থা করা হোক। বছরের বিভিন্ন সময় কৃষকেরা মানববন্ধনসহ বিক্ষোভ ও নানা কর্মসূচী করেও রক্ষা করতে পারছে না তাদের বাপ দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষিজমি।

কেরানীগঞ্জ কৃষি কর্মকর্তা মো. শহীদুল আমীন বলেন, কেরানীগঞ্জে কৃষি যে সৌন্দর্য রয়েছে তা রক্ষা করা চেষ্টা করছি। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোসহ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি ব্যবস্থাকে সুন্দরভাবে ঢেলে সাজিয়ে সবাইকে নিয়ে একত্রে কাজ করতে হবে। সবাই একযোগে কাজ করতে পারলে কৃষি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, কৃষি জমি অকৃষি আবাসন খাতে চলে যাওয়ার দিক লক্ষ করা গিয়েছে, তা থামানো দরকার।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনে ফসলি জমিতে কোনো স্থাপনা বা আবাসন প্রকল্প করার সুযোগ নেই। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কৃষি জমির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছি। ফসলি জমি যাতে আর নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর।