মামুনুলের বিরুদ্ধে আদালতকে যা জানালেন তিন সাক্ষী

মামুনুলের
❏ মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২৫, ২০২২ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা:হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে দায়ের করা ধর্ষণ মামলায় তৃতীয় দফায় আরও তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক নাজমুল হক শ্যামলের আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

এসময় সাক্ষ্য প্রদান করেন- সোনারগাঁ রয়েল রিসোর্টের নিরাপত্তা প্রহরী ইসমাইল হোসেন, রিসোর্টের নির্বাহী কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ও সোনারগাঁ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু। এ নিয়ে এই মামলায় বাদীসহ মোট সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নারায়ণগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পি পি) রকিবুদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে আসামি মামুনুল হককে নারায়ণগঞ্জের আদালতে আনা হয়। দুপুর ১২টায় তাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের হাজির করার পর তার উপস্থিতিতেই ধর্ষণের ঘটনাস্থল সোনারগাঁ রয়েল রিসোর্টের দুই নিরাপত্তারক্ষী ও একজন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য দেন।

এই তিন সাক্ষী আদালতকে জানিয়েছেন, গত বছরের ৩ এপ্রিল মামুনুল হক জান্নাত আরা ঝর্ণা নামের এক নারীকে রয়েল রিসোর্টের একটি কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ওই নারীসহ মামুনুল হক স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়লে তিনি ওই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেও তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়।

পিপি রকিব উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, জান্নাত আরা ঝর্ণার দায়ের করা ধষর্ণ মামলায় মামুনুল হক আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে এ মামলার বাদীসহ পাঁচজন মামুনুল হকের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।

পিপি রকিব বলেন, সাক্ষীরা আদালতে ঘটনার সময়ের নানা তথ্য তুলে ধরেছেন। আদালত তাদের স্বাক্ষ্য নথিভুক্ত করেছে।

এদিকে, মামুনুল হকের আইনজীবী ওমর ফারুক নয়ন দাবি করেন, আদালতে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা মামুনুল হককে ফাঁসাতে মিথ্যা তথ্য তুলে ধরেছেন।

মামুনুল হকের আইনজীবী একেএম ওমর ফারুক বলেন, প্রথম দফায় সাক্ষী দিয়েছেন বাদী। দ্বিতীয় দফায় সাক্ষী দিয়েছেন ৩ জন। তৃতীয় দফায় সাক্ষী দিয়েছেন ৩ জন। এ নিয়ে এ মামলায় ৭ জন সাক্ষী দিয়েছে। সাক্ষীদের আমরা জেরা করেছি। তাদের কথাবার্তায় অসামঞ্জস্য আছে। সাক্ষীরা কথা বলতে পারেন না। এটা একটা সাজানো নাটক। মামুনুল হককে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এ মিথ্যা মামলা সাজানো হয়েছে। আসামিপক্ষে সহযোগিতায় ছিলেন অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান মোল্লা।

আদালত সূত্রে জানা যায়, রয়েল রিসোর্টের কর্মকর্তা ও আনসার সদস্য সাক্ষীতে বলেছেন- মামুনুল হক ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল দুপুর ৩টায় একটি সাদা প্রাইভেটকারযোগে একজন নারী নিয়ে রয়েল রিসোর্টে প্রবেশ করেন।

উপজেলা যুবলীগ সভাপতি নান্নু সাক্ষীতে বলেন, রয়েল রিসোর্টের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে তিনি খবর পেয়ে রিসোর্টে আসেন। এরপর পুলিশ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে নান্নুও রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নাম্বার রুমের সামনে গিয়েছেন। সেখানে গিয়ে সাংবাদিকরা ডাকলে মামুনুল হক নিজেই এসে দরজা খুলেন। তখন মামুনুল হকের সঙ্গে থাকা নারী টয়লেটের ভিতরে ছিল। ওই সময় সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যরা মামুনুল হককে প্রশ্ন করেছেন আপনার সঙ্গে নারীটি কে। তখন তিনি নারীকে তার স্ত্রী পরিচয় দিয়েছেন।

এরপর মামুনুল হকের কাছে তার স্ত্রীর নাম-ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি যে নাম-পরিচয় দিয়েছেন তা নারীর দেওয়া নাম পরিচয়ের সঙ্গে মেলেনি। এ নিয়ে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে মামুনুল হকের বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে হেফাজত ইসলামের কয়েক হাজার লোক এসে নারীসহ মামুনুল হককে রয়েল রিসোর্ট থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যান। এরপর যুবলীগ নেতার বাড়ি, রেস্টুরেন্ট ও দলীয় কার্যালয়ে ভেঙে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করেছেন।

এই ধর্ষণ মামলায় গত ৩ নভেম্বর বিচারকাজ শুরুর পর থেকে আদালত এ পর্যন্ত তিন দফায় মোট সাতজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন। প্রথম দফায় ২৪ নভেম্বর মামলার বাদী জান্নাত আরা ঝর্ণার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। পরে ১৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় মামুনুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন সোনারগাঁ রয়েল রিসোর্টের সুপারভাইজার আব্দুল আজিজ, রিসিপশন অফিসার নাজমুল ইসলাম অনিক ও আনসার গার্ড রতন বড়াল।

আদালতে আসামি মামুনুল হকের উপস্থিতিতেই প্রতি তারিখে এই সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক নাজমুল হক শ্যামলের আদালতে মঙ্গলবার দুপুরে তারা এই সাক্ষ্য দেন বলে পিপি মো. রকিব উদ্দিন আহমেদ জানান।

প্রসঙ্গত, গত বছর ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে রয়েল রিসোর্টে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে নারীসহ অবরুদ্ধ করে স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ লোকজন।

পরে পুলিশ গিয়ে মামুনুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় হেফাজতকর্মী ও মাদ্রাসাছাত্ররা রিসোর্টে হামলা চালায়। তারা ভাংচুর চালিয়ে মামুনুলকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। পরে হেফাজতের নেতাকর্মীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও ভাংচুর করে। তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা হয়। পুলিশ চার শতাধিক গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

এ ঘটনায় জান্নাত আরা ঝর্ণা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে রিসোর্টে নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ এনে ৩০ এপ্রিল সোনারগাঁ থানায় মামলা দায়ের করেন।