অন্ধকার থেকে আলোর পথযাত্রী আধুনিক কেরানীগঞ্জের জনপদ

Keranigonj news
❏ শুক্রবার, জানুয়ারী ২৮, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি : ঢাকার উপকণ্ঠে বুড়িগঙ্গার তীরের জনপদ কেরানীগঞ্জ। ১২ বছর আগেও সন্ধ্যা নামার সাথেই অধিকাংশ ঘরে জ্বলত সাঁঝবাতি। ঢাকার নিকটবর্তী হয়েও অধিকাংশ এলাকা ছিলো বিদ্যুতায়নের বাইরে। কৃষকের জমির মাঝ দিয়ে দেখা যেত বিদ্যুতের খুঁটির পর খুঁটি। রাজধানীর কাছাকাছি থেকেও এ জনপদের অধিবাসীদের ছিল নানা অভিযোগ আর আক্ষেপ। যেই কয়েক জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল তাতেও লোডশেডিং যন্ত্রণা ভোগ করতো গ্রাহকেরা। সেই জনপদ আজ শতভাগ আলোকিত, এখানকার লোকজন আর জানে না লোডশেডিং কী। শুধু খুঁটি নিয়ে আর তারা দিন কাটায় না।

এলাকার অর্ধেক রূপ নিয়েছে নগরে। নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে নানা শ্রেণি পেশার মানুষের আবাসস্থল হয়েছে এই লোকালয়। বিদ্যুতের আলোয় শুধু জনপদ নয়, পরিবর্তিত হয়েছে এখানকার আর্থ-সামাজিক অবস্থাও। কেরানীগঞ্জ এলাকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের হাত ধরে এসেছে গার্মেন্টস শিল্পের অগ্রগতি। কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো নারী পুরুষের। আগানগর-শুভাঢ্যা এলাকায় সুগম হয়েছে গার্মেন্টস শিল্পের পথ। বর্তমানে আগানগর ও শুভাঢ্যা গার্মেন্টস পল্লীতে ১০ হাজারেরও বেশি ক্ষুদ্র তৈরি পোশাক কারখানা দেশের অভ্যন্তরীণ পোশাকের প্রায় ৭০ ভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে জানা যায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কেরানীগঞ্জে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের অত্যাচারে ব্যবসায়ী, বাড়িমালিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অতিষ্ঠ ছিলেন। খুন সন্ত্রাস লেগেই ছিল। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের আনাগোনায় মানুষ থাকতো ভীত সন্ত্রস্ত। এলাকাটি পরিণত হয়েছিল সন্ত্রাসের জনপদে। এখন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম নেই। নেতাকর্মীরা আরও জানান, এলাকায় এখন নোংরা রাজনীতি নেই বললেই চলে। লোকজন নানা উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় অনেকেই স্বেচ্ছায় অপরাধ করা ছেড়ে দিয়েছেন। নিজ দলে কোনো অপরাধী থাকলেও তাদের ছাড় দিচ্ছেন না এমপি বিপু। এ কারণে ঢাকা-২ আসনটিতে তার জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। নেই অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল।

আরও জানান যায়, আগামীতে বিপুল লোকসমাগম হবে এ এলাকায়। এ কারণে স্বল্প জায়গায় কীভাবে অধিক লোকের নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা করা যায় সে নীতিমালা প্রণয়ন চলছে। এলাকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন তৈরি করা হচ্ছে। বিনোদনের জন্য আধুনিক পার্ক এবং উদ্যান তৈরিও এগিয়ে চলেছে। ৩ হাজার একর জায়গার ওপর শেখ হাসিনা স্মার্ট সিটি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেরানীগঞ্জের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন করে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। অনেক খাল উদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর। দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো খনন করা হবে। খাল ও বিলের মধ্য দিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নৌকায় গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে। স্থানীয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শতভাগ বিদ্যুতের ফলে এ এলাকার গার্মেন্টশিল্প বিকশিত হয়েছে। তারা জানান, পুরো গার্মেন্টপল্লীতে ৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ করা হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুসলিম ঢালী বলেন, আমরা চাহিদামতো গ্যাস, বিদ্যুৎ পাচ্ছি। এতে সময়মতো মালামাল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ খুব ভালো থাকায় জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছেন বহুলাংশে। শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও শিল্পের যে প্রসার ঘটেছে তা অবশ্য এক দিনে আসেনি। যুগোপযোগী পদক্ষেপ এ অঞ্চলের রূপ বদলে দিয়েছে। চাওয়ামাত্র এক দিনেই এ জনপদে মিলেছে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস টেবিলে ফাইল জমে থাকার কোনো নজির নেই। বিসিক অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেছে। শিল্প, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় বাড়ছে অবকাঠামো। এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খুঁটির বদলে মাটির নিচ দিয়ে চলছে বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরের কাজ। শুধু কেরানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪। উৎপাদিত বিদ্যুতের ওপর চাপ কমাতে নেওয়া হয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। রোহিতপুরে স্থাপন করা হয়েছে ২১ কিলোওয়াটসম্পন্ন সোলার চার্জিং সিস্টেম। নতুন সাবস্টেশন নির্মাণ ছাড়াও কেরানীগঞ্জের মতিয়ারা পাওয়ার প্লান্টকে ৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম আলোকিত হয়েছে বিদ্যুতের আলোয়। যে প্রজন্ম দেখবে না অন্ধকার। সেই অন্ধকারকে পেছনে ফেলে আলোর পথযাত্রী আধুনিক কেরানীগঞ্জের জনপদ।

তেঘরিয়া ইউপি চেয়ারম্যান হাজি মো. লাট মিয়া বলেন, কেরানীগঞ্জের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। স্কুলগুলোকে ফিডিং কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। স্কুলে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হচ্ছে। স্কুল-কলেজের জন্য বিভিন্ন স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন স্বাধীনতা পরবর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে। কেরানীগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষার পরেই শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ত। কিন্তু এখন তা পাল্টেছে। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত সাফল্যের পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে।

ঢাকা-মাওয়া রোড এলাকার পারভিন বেগম বলেন, ৬০ বছর হইছে, অনেক কিছু দ্যাখিছি। আগে অন্ধকার থাকত, এখন বিদ্যুৎ থাকে সব সময়। স্থানীয়রা জানান, এই সরকারের সময় সারাদেশের মতো এখানেও বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে। প্রতিটি গ্রামের ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। অথচ এক সময় বিদ্যুতের জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে।

উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, ১২ বছর আগে বেশিরভাগ এলাকাতেই বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। অধিকাংশ সময় লোডশেডিং লেগেই থাকত। নসরুল হামিদ বিপুর উদ্যোগে এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। লোডশেডিংও নেই। মাটির নিচ দিয়ে সঞ্চালন লাইনের জন্য করা হচ্ছে পরিকল্পনা।

সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, এ আসনকে নিয়ে অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হলে কেরানীগঞ্জ বসবাসের উপযুক্ত স্থানে পরিণত হবে। সেক্ষেত্রে লোকসমাগমও বাড়বে। গত দিনগুলোতে কী করেছি, তা জনগণই ভালো বলতে পারবেন। তিনি বলেন, দেখেন নির্বাচন আসলে অনেকেই অনেক কথা বলেন। তবে আমি কী করেছি তা জনগণই বলবেন। রাস্তাঘাটে গেলে চোখে পড়বে। এলাকার পরিবেশ নিয়ে কাজ করছি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঢাকা-৩ আসন গড়তে চাই। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়েছি। এখনো তা অব্যাহত আছে।