• আজ বুধবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৫ মে, ২০২২ ৷

হলুদের নতুন জাত উদ্ভাবন, দ্বিগুণ ফলনে ব্যাপক সম্ভাবনা

হলুদের নতুন জাত
❏ সোমবার, মার্চ ৭, ২০২২ তথ্য জাদুঘর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

কামরুজ্জামান মিন্টু, স্টাফ রিপোর্টার: মসলা হিসেবে হলুদ বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয় একটি ফসল। প্রতিদিনের রান্নায় এটি ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মোট চাহিদার তুলনায় হলুদের ঘাটতি থাকার কারণেই বাজারে লাফিয়ে বাড়ছে এই মসলার দাম। এসব দিক বিবেচনা করে বিনা হলুদ-১ নামে উচ্চফলনশীল একটি জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিনা) একদল গবেষক।

গবেষকদের দাবি, বিভিন্ন রোগ সহনশীল এই জাতটি চাষাবাদ করলে অন্য জাতের হলুদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ফলন উৎপাদন হবে। এতে লাভবান হবে কৃষকরা। বাজারে হলুদের ঘাটতি থাকবেনা। এতে কমে যাবে দাম, ক্রেতারা সল্প মূল্যে ক্রয় করতে পারবে।

জাতটির উদ্ভাবক বিনা’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া সহযোগী গবেষক ছিলেন- একই বিভাগের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামসুল আলম মিঠু, সাদিয়া তাসমীন, ফরিদ আহম্মেদ ও নাজমুল হাসান মেহেদী।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, ভারতের আসামের স্থানীয় একটি জাত থেকে হলুদের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের শুরু থেকে পুরোদমে গবেষণা শুরু হয়। গবেষণার ধারাবাহিকতায় সংগৃহীত জার্মপ্লাজমটি বিনা’র প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত উপকেন্দ্রগুলোতে বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে BHL-1 নামক কৌলিক সারিটি সনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে এই সারিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের মাঠে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২০১৯ সালে সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যায়। একই বছর জাতীয় বীজ বোর্ড কৌলিক সারিটিকে বিনাহলুদ-১ নামে নিবন্ধন করা হয়েছে। এখন কৃষক পর্যায়ে জাতটি ছড়িয়ে দিতে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

জাতটির সহযোগী গবেষক সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামসুল আলম মিঠু সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, দীর্ঘ ৩ বছর গবেষণা করে জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এটি চাষাবাদে করলে অধিক ফলনে লাভবান হবে কৃষকরা। জাতটি কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কাজ করা হচ্ছে। কৃষকরা এটি চাষাবাদে আগ্রহী হলে বাংলাদেশে হলুদের বিপ্লব ঘটবে।

এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৩ টন ফলন হয়। যা প্রচলিত জাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। শাঁস আকর্ষণীয়, গাঢ় হলুদ ও শুষ্ক পদার্থের পরিমান শতকরা ৩৮ থেকে ৪০ ভাগ। গাছ লম্বা আকৃতির, পাতা গাঢ় সবুজ ও লম্বা। পূর্ণ বয়স্ক গাছের উচ্চতা ১২৫ থেকে ১৪৫ সেন্টিমিটার। প্রতি গাছে ছড়ার সংখ্যা ২৫ থেকে ২৮টি। ছড়াগুলো ১২ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার চওড়া। পাহাড়ী ও সমতল অঞ্চলে চাষ উপযোগী। সিদ্ধ করে শুকালে রংয়ের পার্থক্য হয়না ও রান্নায় তিতাভাব হয়না। লিফব্লচ ও রাইজোম রট রোগ সহনশীল। বপনের ৩১০ দিনের মধ্যে ফলন সংগ্রহ করা যায়।

ড. শামসুল আলম মিঠু চাষাবাদ সম্পর্কে বলেন, চৈত্র (মধ্য মে থেকে মধ্য এপ্রিল) মাস কন্দ লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে, মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মে (বৈশাখের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত) হলুদের কন্দ রোপন করা যায়। রোপনের জন্য পরিপুস্ট, চকচকে ও রোগবালাইমুক্ত কন্দ নির্বাচন করতে হবে। রোপনের ৪ থেকে ৬ ঘন্টা আগে ব্যভিস্টিন/স্কোর ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে কন্দ ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। তারপর পানি থেকে কন্দ তুলে নিয়ে ছায়ায় শুকিয়ে মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। গাছের উপরের অংশ সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে ফসল সংগ্রহ করতে হবে। ফেব্রুয়ারী মাস ফসল সংগ্রহের উপযুক্ত সময়।

জাতটির উদ্ভাবক বিনা’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, বিনাহলুদ-১ জাতটিকে নিয়ে নানা পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। সারা দেশের মধ্যে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, নওগা, পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, নীলফামারী ও পার্বত্য জেলাগুলোতে জাতটি ব্যাপক চাষাবাদের জন্য কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে জেলার ফুলবাড়িয়ায় প্রদর্শনী হিসেবে ৫০ শতাংশ জমিতে বিনাহলুদ-১ চাষ হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক কৃষককে আমাদের উদ্ভাবিত জাতটি বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। কৃষকরা জাতটি একবার চাষে দ্বিগুণ ফলন পেয়ে প্রতিবার চাষ করবে। পরিকল্পনা মাফিক কৃষকদের দোরগোড়ায় জাতটি ছড়িয়ে দিতে পারলে বাজারে সবচেয়ে সস্তা মসলার নামটি হবে হলুদ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. মতিউজ্জামান বলেন, জেলার কৃষকরা কুমারিকা নামে স্থানীয় একটি জাত আবাদ করেন। গত বছর ১ হাজার ৭৬১ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। এ জাতে প্রতি হেক্টর জমিতে ১৫ থেকে ২০ টন ফলন হয়। বিনাহলুদ-১ উদ্ভাবনের বিষয়টি কৃষকদের জানানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, বিনাহলুদ-১ চাষে প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩৩ টন ফলন হলে কৃষকরা সবচেয়ে বেশী লাভবান হবে। এটি চাষের আওতায় আনতে কৃষকদের সবধরনের সহযোগী ও পরামর্শ দেয়া হবে।