• আজ বুধবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৫ মে, ২০২২ ৷

আজ কেরানীগঞ্জ গণহত্যা দিবস

Keranigonj news
❏ শনিবার, এপ্রিল ২, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, সময়ের কণ্ঠস্বর : আজ ২ এপ্রিল কেরানীগঞ্জ গণহত্যা দিবস। কেরানীগঞ্জবাসীর জন্য ভয়াবহ স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন। ১৯৭১-এর এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কেরানীগঞ্জে প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক নিরস্ত্র বাঙালিকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। এ দিনের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠন, কেরানীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কেরানীগঞ্জ প্রেসক্লাব, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী মহল নানা কর্মসূচি পালন করছে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১ এপ্রিল মধ্যরাতের পর থেকে অর্থাৎ ২ এপ্রিল ভোর থেকে জিঞ্জিরায় সৈন্য সমাবেশ করতে থাকে এবং কেরানীগঞ্জকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। ২ এপ্রিল ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কেরানীগঞ্জে হামলা চালায়। হানাদাররা নির্বিচারে গুলি ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে ঘুমন্ত মানুষ হত্যা করে। সেদিন সৌভাগ্যক্রমে অল্পের জন্য বেঁচে যান সে সময়ের ছাত্রনেতা নুরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, মোস্তফা মহসিন মন্টুসহ অনেকে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানি সেনাদের সশস্ত্র আক্রমণে ঝরে যায় হাজারো নিরীহ বাঙালির প্রাণ। ভস্মীভূত হয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। বাড়িঘর ও দোকানপাটে চলে লুটপাট। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বহু মা বোনের সম্ভ্রমহানি করে। রক্তের বন্যা বয়ে যায় প্রতিটি গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বর্বর ঘটনা ‘কেরানীগঞ্জ গণহত্যা’ নামে পরিচিত হয়ে আছে।

পাকিস্তানিরা ওইদিন গভীর রাতে বুড়িগঙ্গার অন্য পাড়ের মিটফোর্ড হাসপাতাল দখল করে নেয় এবং হাসপাতাল সংলগ্ন মসজিদের ছাদ থেকে আনুমানিক ৫টায় ফ্লেয়ার ছুড়ে গণহত্যা শুরু করার জন্য সংকেত প্রদান করে। আনুমানিক ভোর সাড়ে ৫টা থেকে শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞ একটানা ৯ ঘণ্টা চলে। যা শেষ হয় আনুমানিক আড়াইটায় তারা ঘরবাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। মান্দাইল ডাকের সড়কের সামনের পুকুরের পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনী ৬০ জন লোককে একসঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে।

জিঞ্জিরা গণহত্যার পরের দিন অর্থাৎ ৩ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি প্রচারযন্ত্র জিঞ্জিরা গণহত্যাকে ধামাচাপা দিয়ে বহির্বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা খবর প্রচার করে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সমর্থিত পত্রিকা মর্নিং নিউজের একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘জিঞ্জিরায় দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ’। আর তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশন ওইদিন (২ এপ্রিল ১৯৭১) রাতে খবর প্রচার করে, বুড়িগঙ্গা নদীর অপর পাড়ে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় আশ্রয় গ্রহণকারী বিচ্ছিন্নতাবাদী দুষ্কৃতকারীদের কঠোর হাতে নির্মূল করা হয়েছে।

জানতে চাইলে কালিন্দী ইউনিয়নের বীরমুক্তিযোদ্ধা আবু হাসান মোস্তান বলেন, কেরানীগঞ্জ ছিল শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও রাজধানীবাসীর প্রধান আশ্রয়স্থল। ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার পর থেকে ঢাকা শহরে নিরীহ লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দলে দলে কেরানীগঞ্জে আসতে শুরু করে। পাকিস্তানি সেনারা এ সংবাদ পেয়ে ২ এপ্রিল কেরানীগঞ্জে হামলা চালিয়ে প্রায় ৫ হাজার নারীপুরুষকে হত্যা করে।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান বলেন, ২ এপ্রিল ভোরে যখন পাক সেনারা কেরানীগঞ্জে হামলা চালায় স্থানীয় যুবকরা প্রথমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু হানাদার বাহিনীর অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বাঙালিদের হত্যা করে। বিভীষিকাময় ঘটনাগুলো স্মরণ করে তিনি বলেন, হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শেষে চলে গেলে সন্ধ্যার পর শহীদদের লাশ কালিন্দি, নেকরোজবাগ, ইমামবাড়ি, কসাইভিটা, নজরগঞ্জ ও কালীগঞ্জ কবরস্থানসহ বিভিন্ন স্থানে গণকবর দেয়া হয়। কোন কোন কবরে ১৬/১৭ জনকেও রাখা হয়েছিল। এমনকি ধানক্ষেতেও শহীদদের মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। মনুবেপারীর ঢাল, কসাই ভিটা, ইমামবাড়ি ও নজরগঞ্জে চারটি গণকবর রয়েছে।

তৎকালীন ঢাকা জেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা মহসিন মন্টু সেই দিনের ভয়ার্ত স্মৃতির বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, পুরো ঢাকা শহর তখন পাকিস্তানি সেনারা অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এই বন্দিনগরী থেকে মুক্তি পাবার প্রধান উপায় ছিল বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নেয়া। পাকবাহিনী ২৫ মার্চ কাল রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা শহরে কার্ফু দিয়ে মর্টার ও মেশিনগান চালিয়ে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করে। ২৬ মার্চ ২ ঘণ্টার জন্য কার্ফু শিথিল করলে ঢাকা শহরের আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, শুভাঢ্যা, আগানগর, কালিন্দী ও কামরাঙ্গীরচর হয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়। কেরানীগঞ্জের প্রতিটি মানুষ অসহায় শরণার্থীদের সাহায্যে তাদের সঞ্চিত টাকাপয়সা, খাবার দাবার সব কিছু উজাড় করে আপন করে নেয়। একটানা ৪/৫ দিন ধরে শরণার্থীদের সেবা করতে গিয়ে ১ এপ্রিল রাতে কেরানীগঞ্জবাসী যখন ক্লান্ত দেহে গভীর ঘুমে আচ্ছন, ঠিক তখনই ২ এপ্রিল ভোরে পাক হানাদার বাহিনীর মর্টার ও মেশিনগানের মুহুর্মুহু শব্দে তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভোর ৬টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বর্বর পাক সেনারা নারকীয় তান্ডব চালায়। বর্বরোচিত তান্ডবে ওই দিন কেরানীগঞ্জে পাঁচ সহস্রাধিক নিরস্ত্র মানুষ প্রাণ হারায়।

তিনি আরও বলেন, ২৬ মার্চ কেরানীগঞ্জ থানা দখল ও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। জাতীয় নেতাদের বড় অংশ এখানে আশ্রয় নেন এবং পরে নিরাপদ স্থানে চলে যান। এ পথ দিয়ে শেখ ফজলুল হক মনি, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, আব্দুল মালেক উকিল, তোফায়েল আহমেদ ও শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ ভারতে পাড়ি জমান। ২৫ মার্চ ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ চলার ঘটনা ও জাতীয় নেতাদের কেরানীগঞ্জে আশ্রয়ের খবর বিবিসিতে প্রচার হলে পাক হায়েনার দল কেরানীগঞ্জে আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়, তার ধারাবাহিকতায় ২ এপ্রিল ভোরে কেরানীগঞ্জে হামলা করে অগ্নিসংযোগসহ নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।