• আজ বুধবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৫ মে, ২০২২ ৷

সন্তানদের সময় দিতে ও পর্দা করতে সরকারি চাকরি ছাড়লেন বিসিএস ক্যাডার মা

চাকরি
❏ শনিবার, এপ্রিল ২, ২০২২ আলোচিত বাংলাদেশ, ময়মনসিংহ

কামরুজ্জামান মিন্টু, স্টাফ রিপোর্টার: ময়মনসিংহের গৌরীপুরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জান্নাত ই হুর সেতু। চাকরির কারণে সন্তানদের ঠিকমত সময় দিতে পারতেন না। এছাড়া কর্মস্থলে পর্দার খেলাপ হওয়ায় সরকারি চাকরি নামের সোনার হরিণটি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।

কর্মজীবন থেকে বৃহস্পতিবার (৩১ মার্চ) স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে সহকর্মীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন এই নারী কর্মকর্তা। সন্তানদের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকারের দিনটিতে তার বাসা বেলুন দিয়ে সাজিয়ে, ফুলের তোড়া দিয়ে ও কেক কেটে জান্নাতকে বরণ করে নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জান্নাত শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী উপজেলার রাণীশিমুল গ্রামের মো. জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ ম্যানেজমেন্টে এমএস সম্পন্ন করেন। একই বছর ২৯তম বিসিএস (মৎস্য) ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। সে বছরই সহপাঠী সানোয়ার রাসেলের সঙ্গে আবদ্ধ হন বিয়ের বন্ধনে। স্বামী বর্তমানে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত।

জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় জান্নাতের। ২০১৫ সালে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। ব্যক্তিগত জীবনে তিন কন্যাসন্তানের জননী। স্বামী, শাশুড়ি ও সন্তানদের নিয়ে ময়মনসিংহ নগরীর নজরুল সেনা স্কুলরোড এলাকায় বসবাস করেন।

চাকরি ছেড়ে দেয়ার কারন সম্পর্কে জান্নাত ই হুর সেতু সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘আমাদের বড় মেয়ের বয়স ৯ বছর। মেজ মেয়ে ৫ বছর ও ছোট মেয়ের বয়স ১৮ মাস। বড় মেয়ের জন্মের পর আমার শাশুড়ি মা লালন-পালন করতেন। ছোট দুই বাচ্চাকে লালন-পালন করতে বৃদ্ধা শাশুড়ি মা অনেক কষ্ট করেন। এদিকে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সরকারি চাকুরীজীবি হওয়ার কারনে সন্তানদের ঠিকমত সময় দিতে পারিনা। ফলে সন্তানরা বাবা-মায়ের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

এছাড়া আমি যে চাকরিটা করি সেখানে শুধু মহিলারাই কাজ করেন না। সেখানে পুরুষরা চাকরি করেন। তাছাড়া, মাঠে গিয়ে অনেক সময় কাজ করতে হয়। যে কারণে অনেক সময় পর্দার খেলাপ হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবনে উচ্চাকাঙ্ক্ষা না থাকায় তেমন কোনো চাহিদা নেই। তেমন আর্থিক সংকটও নেই। সবদিক চিন্তা করে চাকরি ছাড়ার সীদ্ধান্ত নিই।’

জান্নাতের স্বামী সানোয়ার রাসেল সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘সব সন্তানরাই চায় বাবা-মা বেশি সময় ধরে তাদের কাছাকাছি থাকুক। বিশেষ করে মা’কে কাছে পেলেও সন্তানরা আনন্দে থাকে। সারাদিন কাজ শেষে দুজন বাসায় ফিরে সন্তানদের দেখে মন খারাপ হত। কারণ, সারাদিন কেউ আদর করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘এছাড়া সে খুব ধার্মিক। সব সময় পর্দা করে। সে হয়তো ব্যক্তিগতভাবে কর্মস্থলে তার মতো করে পর্দা করতে পারছে না। তবে, বিষয়টা এমন না যে মেয়েরা সরকারি চাকরি করতে পারবে না। এটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিয়য়। সে চাকরি ছেড়ে দিতে চাইলে আমিও তাকে বাঁধা দেইনি। কারণ, সে ঘরে ও বাইরে দ্বিগুণ পরিশ্রম করছে। এখন থেকে সংসারের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করার দায়িত্ব আমার। স্বামী হিসেবে আমি আমার স্ত্রীর চিন্তা ও দর্শনকে সম্মান জানাই।’