• আজ বুধবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৫ মে, ২০২২ ৷

নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ঢাবি ছাত্রী এলমা: ডিবি

এলমা
❏ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৪, ২০২২ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী এলমা চৌধুরীকে হত্যা করা হয়নি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ি।

প্রায় চার মাস তদন্তের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ডিজিটাল-ফরেনসিক প্রমাণের পাশাপাশি আসামি ও অন্য সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, এলমা আত্মহত্যা করেছেন। তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন স্বামী ইফতেখার আবেদীন, শাশুড়ি শিরিন আমিন ও শ্বশুর মো. আমিন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এলমা আত্মহত্যা করেন।

জানা গেছে, ফ্রান্সে থাকাকালে ইফতেখার প্রথম বিয়ে করেন। এ সংসারে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। ২০২০ সালে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ইফতেখারের বিচ্ছেদ হয়। পরে অ্যাপসের মাধ্যমে এলমার সঙ্গে ইফতেখারের পরিচয় হয়। পরিচয়ের ৮ দিনের মাথায় গত বছরের ২ এপ্রিল ইফতেখার-এলমার বিয়ে হয়।

তদন্তে ডিবি জানতে পারে, এলমার সঙ্গে বিয়ের দুই মাস পর ইফতেখার কানাডায় চলে যান। দেশে আসেন গত বছরের ১১ ডিসেম্বর। এই দম্পতি একে অন্যকে বিশ্বাস করতেন না। ১৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে এলমা ও ইফতেখারের মধ্যে ঝগড়া হয়। এলমা রাতেই স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইফতেখার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সব পথ তালা দিয়ে বন্ধ করে দেন। একপর্যায়ে এলমা ছবির অ্যালবাম ভেঙে নিজের গলা কেটে ফেলার চেষ্টা করেন। তখন এলমাকে বেধড়ক মারধর করেন ইফতেখার।

পরদিন সকালে আবার দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। এলমা জানিয়ে দেন, তিনি আর ইফতেখারের সঙ্গে থাকতে চান না। ইফতেখার নিজেদের শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। মিনিট দশেক বাদে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখেন দরজা লাগানো। চাবি দিয়ে লক খুলতে গিয়ে গৃহকর্মী দেখেন, দরজায় ছিটকিনি দেওয়া। পরে গাড়িচালককে সঙ্গে নিয়ে ইফতেখারের বাবা মো. আমিন দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন। নিচ থেকে কুড়াল নিয়ে এসে দরজা কেটে তাঁরা ভেতরে ঢোকেন। ভেতরে ঢুকে দেখেন, গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় এলমার দেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে। এলমার পা উঁচু করে তুলে ধরেন ইফতেখার। গৃহকর্মী বঁটি দিয়ে ওড়না কেটে ফেলেন। এলমাকে পরে ধরাধরি করে গাড়িতে তোলা হয়। ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা এলমাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এলমার মৃত্যুর এক দিন পর বাবা সাইফুল রাজধানীর বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় এলমার স্বামী ইফতেখার আবেদীন, শাশুড়ি শিরিন আমিন ও শ্বশুর মো. আমিনকে আসামি করা হয়। এই তিনজন পারস্পরিক যোগসাজশে এলমাকে হত্যা করেছেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত ১৪ ডিসেম্বর ইফতেখার জানান, এলমা গুরুতর অসুস্থ। তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। স্ত্রী ও ভায়রাকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন বিকেল পাঁচটার দিকে হাসপাতালে পৌঁছান সাইফুল। তিনি হাসপাতালের ট্রলিতে এলমার লাশ দেখতে পান। লাশের পাশে ছিলেন ইফতেখার ও তার বাবা মো. আমিন। এ সময় তাদের আচার-আচরণ স্বাভাবিক ছিল না।

সাইফুল অভিযোগ করেন, বিয়ের পরপরই ইফতেখার ও তার বাবা-মা এলমার লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চান। রাজি না হওয়ায় তারা এলমার চুল কেটে দেন। সাংসারিক নানা কাজের জন্যও এলমার ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হতো।

সুরতহাল প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সাইফুল মামলার এজাহারে লেখেন, এলমার নাকে, ওপরের ঠোঁটে, ঘাড়ে, গলার উপরিভাগে থুতনিতে, পিঠের ডান পাশে, দুই হাতে, দুই পায়ের বিভিন্ন জায়গায় জখমের কালচে দাগ ছিল। এ ছাড়া তার বাঁ কানে আঘাত ছিল। দুই হাতের আঙুল কাটাছেঁড়া ছিল। পায়ের বুড়ো আঙুল ছেলা ছিল।

জানতে চাইলে এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী গত বলেন, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তাকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, এলমাকে তার স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ি হত্যার পর আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছেন। ডিবি যদি তার মেয়ের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়, তবে তিনি ‘নারাজি’ দেবেন।