• আজ সোমবার, ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৩ মে, ২০২২ ৷

পেনশনের টাকায় চলছে অনাথ আশ্রম ‘চাঁদমনি’

Nilphamari news
❏ মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৬, ২০২২ রংপুর

মোঃ ফরহাদ হোসাইন, নীলফামারী প্রতিনিধি: অবহেলিত অনাথ শিশুদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছে নিঃসন্তান পিজিরুল আলম দুলাল (৭৮)। নিজের পেনশনের টাকায় শুরু করেন মা-বাবা হারানো মেয়েদের নিরাপদ একটি আশ্রয় স্থল নাম দিয়েছেন ‘চাঁদমনি’।

১৯৯৮ সালে দুলালের স্ত্রী মোতাহারা বেগম মারা যান। স্ত্রীকে হারানোর পর একা হয়ে পড়েন। তখন সমাজের অবহেলিত ও অনাথ শিশুদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন জাগে। স্ত্রী হারানোর ব্যাথা ও নিঃসন্তান জীবনের ঠাঁই পেতে ২৩ বছর আগে পিজিরুল আলম দুলাল গড়ে তুলেন মেয়ে শিশুদের জন্য একটি অনাথ আশ্রম।

বাবা মায়ের পরামর্শে ওই গ্রামে ১৯৯৯ সালে গড়ে তোলেন ‘চাঁদমনি’ নামে দরিদ্র অসহায় মেয়েদের জন্য একটি অনাথ আশ্রম। সেখানে বর্তমানে ৩৫ জন বিভিন্ন বয়শের মেয়ে পড়ালেখা করছেন। ওই আশ্রমের ধারণ ক্ষমতা ৪৫-৫০ জনের।

অনাথ মেয়ে শিশুদের কথা চিন্তা করে প্রথম ৫ জন শিশু দিয়ে যাত্রা শুরু করেন দুলাল। এখন চাঁদমনি ২৩ বছরে পা দিয়েছে। তিনি জানান, ৭০০-৮০০ মেয়ে শিশু লেখাপড়া শিখে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থান করে নিয়েছে। সমাজসেবা মূলক কাজের জন্য জেলায় পরিচিতি পেয়েছে ‘চাঁদমনি’।

দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে চাঁদের আলো ছড়াচ্ছেন ‘চাঁদমনি’ তাঁর পৈত্রিক ভিটা চাঁদমনিতে বিনা মূল্যে থাকা, খাওয়া ও লেখাপড়ারসহ ৩৫ জন (দ্ধিতীয় শ্রেণি থেকে আইএ পর্যন্ত) শিক্ষার্থী জলঢাকা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। আর এসব খরচ চালিয়ে যাচ্ছে ‘চাঁদমনির’ প্রতিষ্ঠাতা দুলাল। বিশেষ করে যাদের বাবা নেই, মা নেই অথবা বাবা, মা দু,জনে নেই এমন শিশুদের শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করায় এলাকায় বেশ সুনাম কুড়িয়েছে তিনি।

স্থানীয়রা জানান, “অনাথ কন্যারা তার কাছে পেয়েছেন ভরসার হাত আর মমতার পরশ, অনাথ কন্যাদের পরম যত্নে লালন করতে গিয়ে ক্ষয়েছেন অনেক সম্পদ। তাতে তার কোন আফসোসের রেখা নেই, নেই কোন দুঃখ। তার যত্নের হাত যাদেরকে স্পর্শ করেছে তাদের অনুভূতিতে উপলব্ধিতেও তিনি থাকেন সর্বদা।”

১৯৯৯ সালে জেসমিন বানু নিপা, অঞ্জুয়ারা নিশা, প্রীতি, স্মৃতি ও নীলাকে দিয়ে যাত্রা করেন ‘চাঁদমনি’। তাঁরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেকেই এখন স্বাবলম্বী। তাঁদের পরে আসে রুবি, দীপা, হেলালি ও নুপুরসহ অনেকে।

বর্তমানে ৩৫ জনের মধ্যে জাকিয়া, পিংকি, ফেরদৌসি, শান্তনা, সুমা, লাভলি, আরেফা, আশামনি, নিশাদ, তানজিলা, দুলালী, পিয়া, হাবিবা, নদী, রুবিনা, রুজিনা (দুই বোন), মুনমুন, মেজিকা (দুই বোন) মঞ্জিলা, মম, মিতু (দুই বোন) এদের বাবা মা কেউ নেই, মিম, মিনি আকতার, মোজকা আকতার সহ আরো কয়েকজন।

এসময় তারা কান্না কন্ঠে বলেন, “আমরা এখানে অনেক খুশি আছি। আমাদের নতুন কাপড় থেকে শুরু করে পড়া-লেখার সব দেন। আমাদের অনেকেরই তো বাবা-মা নাই, আমাদের দেখার মত তো কেউ নাই। মামাই আমাদের সব কিছু চালায়, কোন কষ্ট বুঝতে দেয় না।”

শিশুদের নিরাপত্তার ব্যাপারে পিজিরুল আলম দুলাল জানান, “লেখাপড়ার জন্য নিরিবিলি পরিবেশ, রয়েছে হলরুম ও বইয়ের লাইব্রেরি, পড়ার জন্য নিজ নিজ কক্ষে রয়েছে চেয়ার ও টেবিল। ক্লাসের বই পড়া ছাড়াও ছবি আঁকা, বির্তক প্রতিযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ছোট গল্প, উপন্যাস ও বড় বড় গুণী জনের জীবনী পড়ার প্রতিযোগিতা। এভাবে ২৩ বছর ধরে চলছে অনাথ আশ্রম ‘চাঁদমনি’।”

পিজিরুল আলম দুলাল হলেন, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নের চাওড়াডাঙ্গী গ্রামের সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। ১৯৯৬ সালে উত্তরা ব্যাংকের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি। তার বাবার নাম মোসলেম উদ্দিন আহমেদ একজন স্কুলশিক্ষক ও মাতা পিয়ারা আহমেদ সমাজকর্মী ও ঢাকার গোপীবাগের একটি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন।