• আজ বুধবার, ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ ৷ ২৫ মে, ২০২২ ৷

‘প্রচণ্ড গরমে’ ভারত-পাকিস্তানের কয়েক হাজার মানুষের প্রাণনাশের আশঙ্কা


❏ শনিবার, মে ৭, ২০২২ আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত দুই মাস ধরে ভারত ও পাকিস্তানে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ বইছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে টানা সাতদিন ধরে তাপাঙ্ক ছিল ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইটের চেয়ে বেশি।

বার্তাসংস্থা সিএনএন- এর আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই দিনগুলির তাপমাত্রা ছিল এপ্রিল মাসের গড়ের চেয়েও তিন ডিগ্রী এগিয়ে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে এই তাপপ্রবাহ আরও বাড়বে এবং ‘প্রচণ্ড গরমে’ দেশ দুটির হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন শীর্ষ জলবায়ু বিজ্ঞানী।

বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ওই জলবায়ু বিজ্ঞানীর রবার্ট রোহডের বরাতে এএফপি জানিয়েছে,তিনি বার্কলে আর্থ নামের একটি অলাভজনক পরিবেশবাদী সংস্থায় শীর্ষ বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন। এ সপ্তাহে প্রকাশিত একটি গবেষণার ভিত্তিতে রবার্ট রোহডে এক টুইটার পোস্টে বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বায়ুর তাপমাত্রার মধ্যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। সূর্যকিরণে বালু যেমন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তেমনি ভূপৃষ্ঠের মাটিও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

আবহাওয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বায়ুর তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে গেছে। এই ভয়ংকর তাপপ্রবাহের কারণে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে পারে।’

রবার্ট রোডহে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্যালিফোর্নিয়া যেমন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াও তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে আছে।’

গ্রীষ্ম কেবল পা রেখেছে, আর তাতেই দাবদাহে পুড়ছে উপমহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ভারত ও পাকিস্তানের কিছু কিছু জায়গায় এরমধ্যেই রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছে গেছে তাপমাত্রা। খরতাপ এত অসহনীয় যে তাতে প্রাণের ঝুঁকিতে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ, আর এসব কিছুর জন্য বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আর জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু একটি তথ্যই যে কারো টনক নড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তা হলো- গত এপ্রিলে উত্তরপশ্চিম ও মধ্য ভারতে গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১২২ বছর আগে তাপ রেকর্ড শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ, এত সুদীর্ঘ বছরের ইতিহাসে এমন ছাড়খার করা উত্তাপের দেখা মেলেনি।

ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের তথ্যমতে, এপ্রিলে আলোচিত দুই অঞ্চলে তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩৫.৯ ও ৩৭.৭৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে ভারত ও পাকিস্তানে তাপমাত্রা ছিল ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বলা হচ্ছে, বছরের উষ্ণতম মাস এই অঞ্চলে এখনো আসেনি। ভারতের পরিবেশবিজ্ঞান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৯৮০ সাল থেকে ভারতে তাপপ্রবাহে মৃত্যুর হার ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রধান পেটেরি তালাস এ সপ্তাহে বলেছেন, ‘কৃষি, পানি, জ্বালানি সরবরাহ এবং অন্যান্য খাতে ইতিমধ্যে ‘‘জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব’’ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’

হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যামিলো মোরা বলেছেন, ‘এ ধরনের পরিবেশ বিপর্যয় দেখে বেশির ভাগ মানুষ হতবাক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হতবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা বহু বছর ধরে পরিবেশের এই বিপর্যয়ের ব্যাপারে সতর্ক করে আসছি।’ তাপপ্রবাহের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চল (ভারত ও পাকিস্তান) এবং অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতের প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে দেশটির দক্ষিণপূর্ব সিন্ধু প্রদেশের জ্যাকোবাবাদ ও সিবি শহরে গত শুক্রবার তাপাঙ্ক রেকর্ড হয়েছে ৪৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১১৬.৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট। পাকিস্তনের আবহওয়া বিভাগ জানিয়েছে, ওইদিন উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত বিশ্বের যেকোনো শহরের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা ওই দুটি শহরেই রেকর্ড করা হয়।

পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী শেরী রেহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, “কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার ‘বসন্তহীন’ একটি বছর পাকিস্তানে দেখা যাচ্ছে।”

সে তুলনায় ভারতের বরাত ভালো। চলতি সপ্তাহেই সেদেশে তাপমাত্রা কমে আসার আভাসা দিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি)। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু সংকট আরও ঘন ঘন ও দীর্ঘ তাপদাহের জন্ম দিবে, এতে ভারত ও পাকিস্তান এ দুই দেশের শত কোটির বেশি জনতার জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) তথ্যমতে, জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে বাজেভাবে প্রভাবিত দেশ দেশগুলোর মধ্যে ভারতও থাকবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

আইপিসিসি প্রতিবেদনের শীর্ষ লেখক এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট ফ্র হিউম্যান সেটেলমেন্টস- এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. চাঁদনী সিং বলেন, “আমরা গরমের তীব্রতা বাড়তে দেখছি, তাপদাহ শুরুর সময়ও এগিয়ে আসছে, থাকছে আগের চেয়ে দীর্ঘসময় ধরে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই আশঙ্কাই করেছিলেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর যার ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে চলেছে।”

শস্যের ক্ষতি:

গ্রীষ্মকালের মে ও জুন মাসেই সাধারণত তাপদাহ দেখা যায় ভারতে, কিন্তু এবছর শীত বিদায় নিতে না নিতেই মার্চ ও এপ্রিল থেকে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে।

‘ভারতের রুটির ঝুড়ি’খ্যাত উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য পাঞ্জাবে লাখ লাখ কৃষি শ্রমিক গরমে ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়ছে। প্রচণ্ড উত্তাপে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির গমের ফসল ঝলসে যাচ্ছে। অথচ এই ফসলের ওপর নির্ভর করছে ভারতের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের অন্নের যোগান।

পাঞ্জাব রাজ্যের কৃষি পরিচালক গুরবিন্দর সিং জানিয়েছেন, এপ্রিলে গড়ে ৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপবৃদ্ধি গমের ফলন কমিয়ে দিয়েছে।

তিনি সিএনএনকে বলেছেন, “তাপদাহের কারণে আমরা হেক্টরপ্রতি ৫ কুইন্টাল (৫০০ কেজি) ফলন কমে আসার অনুমান করছি।”

আইপিসিসি’র গবেষক চাঁদনী সিং বলেছেন, প্রচণ্ড তাপে কৃষি শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

“কৃষক, নির্মাণ শ্রমিক, দিনমজদুরসহ যেসব মানুষ বাড়ির বাইরে কায়িক পরিশ্রম করেন তাদের কষ্টই হবে সর্বাধিক। কাজের কারণে একটু জিরিয়ে নেওয়া বা ঠাণ্ডা হওয়ার সুযোগও তাদের কম, নিজের বা পরিবারের খাদ্য যোগাতে গরমের মধ্যেই তাদের কাজে যেতে হচ্ছে।”

স্কুল বন্ধ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিচ্ছিন্নতা:

ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস কয়লা। দেশটির কোনো কোনো স্থানে বিদ্যুৎ চাহিদা নাটকীয় হারে বাড়ায় দেখা দিয়েছে কয়লার স্বল্পতা। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লাখ লাখ মানুষকে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। কয়েকটি এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৯ ঘণ্টাও হয়েছে লোডশেডিং।

গত সপ্তাহে দিল্লির মোট পাঁচটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে তিনটিতেই কয়লার মজুদ অতি-নিম্ন মাত্রায় বা ২৫ শতাংশে নেমে আসে। অথচ বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এসব কেন্দ্রের ওপর রাজ্যটির রয়েছে ব্যাপক নির্ভরশীলতা।

জরুরি ভিত্তিতে কয়লাবাহী ট্রেন চলাচলে গতি আনতে চলতি মে মাসের শেষপর্যন্ত নির্ধারিত শিডিউলের ৬৫০টি ট্রেন ক্যানসেল করেছে ভারত। দ্রুতগতিতে সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির কয়লার মজুদ পূরণে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে দেশটির রেল মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ভারতীয় রেলওয়ে সারা দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কয়লার একটি প্রধান সরবরাহকারী। পশ্চিমবঙ্গ এবং ঊড়িষ্যাসহ ভারতের কয়েকটি রাজ্য ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা মোকাবিলা করতে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, “স্কুলে যাওয়া অনেক শিশুর নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তারা এই দাবদাহ সহ্য করতে পারছে না।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবশ্য ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলো উভয়েই দাবদাহের ভয়াবহতা প্রশমনে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে স্কুল বন্ধ করা থেকে শুরু করে জনগণকে স্বাস্থ্য নির্দেশনা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ।

তবে চাঁদনী সিং মনে করেন, আগামীর আরও ভয়াল তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় এখন থেকেই আরও বেশি প্রস্তুতি নিতে হবে।

“উত্তাপ মোকাবিলার কোনো কর্মপরিকল্পনা আমাদের নেই, দিন দিন পরিকল্পনার সাথে বাস্তবতার ব্যবধান বেড়েই চলেছে। মানিয়ে চলা বা অভিযোজন সক্ষমতারও একটি সীমা রয়েছে। প্রতিনিয়ত দাবদাহ যেন মানুষের টিকে থাকার সেই সীমাকেই পরীক্ষার মধ্যে ফেলছে।”