ছুরি-চাপাতি বানাতে ব্যস্ত কেরানীগঞ্জের কামারপট্টি

কেরানীগঞ্জ
❏ মঙ্গলবার, জুলাই ৫, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: আর কয়েকদিন বাদেই কোরবানির ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে অনেকটাই ব্যস্ত সময় পার করছেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের কামাররা। দগদগে আগুনে গরম লোহায় ওস্তাদ-সাগরেদের পিটাপিটিতে মুখর হয়ে উঠেছে কামারশালাগুলো। আর এসব ধাতব সরঞ্জামাদি শান দিতে শানের দোকানগুলোতেও ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। ভ্রাম্যমাণ শানদানিদেরও অনেক ভালো সময় কাটে এই মৌসুমে। উপজেলার জিনজিরা, শুভাঢ্যা, রোহিতপুর, হযরতপুর, শাক্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।

উপজেলার জিনজিরা তাওয়াপট্টি বাজার ঘুরে দেখা যায়, হাপর দিয়ে কয়লার আগুনে লোহা পুড়িয়ে লাল করে, ছোট-বড় নানা আকারের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তৈরি করা হচ্ছে- ছুরি, বটি, দা, চাপাতি ইত্যাদি। নতুন ছুরি, বটি, দা ও চাপাতি বানানোর পাশাপাশি পুরনোগুলোর শান দেওয়ার কাজও করতে হচ্ছে সমানতালে। ক্লান্তিহীনভাবে চলছে কাজ। কথা বলার একদম ফুরসত নেই। এভাবে গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার তাওয়াপট্টি কারিগররা। এ সময় বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি ১০০-২০০, দা ২০০-৩৫০ টাকা, বটি ২৫০-৫০০, পশু জবাইয়ের ছুরি ৩০০-১০০০ টাকা, চাপাতি ৫০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর ঈদ উপলক্ষে দা, চাপাতি ও ছুরির দাম অনেক বেশি।

কথা হয় কামার প্রদ্বীপ কর্মকারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সারাবছর বেচাকেনা টুকটাক হয়ে থাকে। কোনোরকম দিন যায়। এই সময়ের জন্য সারাবছর অপেক্ষায় থাকি। কোরবানির ঈদের আগে এক সপ্তাহ ভালো বেচাকেনা হয়। ওই সময় দামও ভালো পাওয়া যায়।’ দোকানি আব্দুল জব্বার বলেন, ‘কোরবানির ঈদ আসলে আমাদের বেচা-বিক্রি বেড়ে যায়। ঈদের দুই সপ্তাহ আগে থেকে কাজের চাপে দম ফেলার অবস্থা থাকে না। এ বছর চায়নার তৈরি স্টিলের সরঞ্জাম কিনছে অনেকে। তাই তাদের সঙ্গে পালস্না দিয়ে তারাও ভালো মানের জিনিস তৈরি করছেন। এরপরও শানের কাজ বেশি।’

জান্নাত এন্টারপ্রাইজ দোকানি হাতেম আলী জানান, কেরানীগঞ্জের জিনজিরা অন্যতম ব্যস্ত কামারপট্টি। এখান থেকেই পুরো শহরে মোটামুটিভাবে সব কামার সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। কামার উজ্জ্বল কর্মকার বলেন, ‘প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই আমাদের দা, বটি, চাকু ও ছুরি তৈরির কাজে বাড়ে। কিন্তু সারাবছর আর এসব জিনিসের তেমন আর কাজ হয় না বললেই চলে।’

দা, বটি, ছুরি ও চাকুর পাশাপাশি কেরানীগঞ্জের স্থানীয় বাজারগুলোতে মাংস বানানোর কাজের জন্য গাছের গুঁড়ি বা খাটিয়া, হোগলার চাহিদাও বেড়েছে ব্যাপক। স্থানীয় বাজারগুলোতে কিনতে কসাইসহ অনেকেই ভিড় করছেন। খাটিয়া ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া বলেন, ‘আমি মূলত ভ্যানে করে মৌসুমী ফলমূল বিক্রি করি। তবে কোরবানির পশুর মাংস কাটতে গাছের গুঁড়ির খাটিয়া প্রয়োজন হওয়ায় এবং চাহিদা বেশি থাকায় ফল বিক্রি বাদ দিয়ে খাটিয়া বিক্রি করছি।’ তিনি বলেন, করাতকল থেকে ৩০টি খাটিয়া এনেছি। দুই তিন দিনের মধ্যেই বিক্রি করতে পারব।

হযরতপুর বাজারের আরেক খাটিয়া ব্যবসায়ী হারুন হোসেন বলেন, ‘বাজারে বিভিন্ন গাছের খাটিয়া রয়েছে। তবে মূলত তেঁতুল গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি খাটিয়া কোরবানির পশু কাটতে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। এই গাছের গুঁড়ি থেকে পাউডার উঠে না। একটি গুঁড়ি খাটিয়া ৪০০-৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। হোগলা ব্যবসায়ী রেজা সিকদার জানান, বরিশাল সদরের টিয়াখালী গ্রাম থেকে হোগলা এনেছেন তিনি। কোরবানির কথা চিন্তা করে সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবছরই এগুলো তৈরি করেন। ৪-৫ হাত প্রস্থ ও ৫ হাত লম্বা একেকটি হোগলার দাম ২৫০-৩০০ টাকা।

উপজেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি আক্তার জিলানী খোকন জানান, ‘কোরবানি ঈদে তারা প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের উপকরণ তৈরি করেন। বর্তমানে লোহা ও কয়লার দাম অনেক বেড়েছে। সে তুলনায় কামারশিল্পের উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়েনি। এ ছাড়া আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব পণ্য তৈরির বেশকিছু প্রযুক্তি-নির্ভর হওয়ায় কামার সম্প্রদায় আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।’